০১:৪৭ এম
একটি সোনালি বল। এটি ফুটবলারের কাছে শুধুমাত্র একটি পুরস্কার নয়, বরং স্বপ্নের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। মাঠে অসংখ্য গোল, ট্রফি এবং ব্যক্তিগত কীর্তির মাঝে যে সম্মান একজন খেলোয়াড়কে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়, সেটি হল ব্যালন ডি’অর। কিন্তু এই পুরস্কারের সূচনা হয়েছিল একটি ছোট পরিসরে। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের ফুটবল সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ইউরোপের সেরা ফুটবলারকে স্বীকৃতি দিতে এই আয়োজন শুরু করে। প্রথমবার পুরস্কারটি জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউস, যিনি তখন ৪১ বছর বয়সী ছিলেন।
ছোট পরিসরের সেই আয়োজন আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। সাত দশকের ইতিহাসে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি, রোনালদো নাজারিও, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের নাম।
শুরুর দিকে ব্যালন ডি’অরের জন্য শুধুমাত্র ইউরোপীয় নাগরিকত্ব থাকা ফুটবলাররাই বিবেচিত হতেন। ফলে পেলে কিংবা ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা ইউরোপের ক্লাবে খেললেও পুরস্কারটির জন্য যোগ্য ছিলেন না। ১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তন করে ইউরোপের ক্লাবে খেলা সব দেশের ফুটবলারদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। সেই বছর প্রথম নন-ইউরোপীয় হিসেবে পুরস্কারটি জিতেছিলেন লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ। ২০০৭ সালে যোগ্যতার পরিধি আরও বাড়িয়ে বিশ্বের যেকোনো লিগে খেলা ফুটবলারদের জন্য ব্যালন ডি’অর উন্মুক্ত করা হয়।
আরও পড়ুন: এবার জার্মানির ২৪ সদস্যের দল দিলেন ক্লপ
২০১০ সালে ফ্রান্স ফুটবলের ব্যালন ডি’অর ও ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার একীভূত হয়ে ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’ নাম ধারণ করে। ছয় বছর পর আবারও দুই আয়োজন আলাদা হয়ে যায়। ফিফা চালু করে ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কার। ২০২৪ সাল থেকে ব্যালন ডি’অর আয়োজনে ফ্রান্স ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উয়েফা।
কীভাবে হয় ভোটিং?
ব্যালন ডি’অরের বিজয়ী নির্ধারিত হন সাংবাদিকদের ভোটের মাধ্যমে। ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের বিভাগে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে সাংবাদিক ভোট দেন। নারীদের বিভাগে ভোট দেন শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিক। ফ্রান্স ফুটবলের সম্পাদকীয় দল প্রথমে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর ভোটাররা সেখান থেকে নিজেদের পছন্দের সেরা ১০ জনকে নির্বাচন করেন।
প্রথম পছন্দের জন্য ১৫ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে, দ্বিতীয় পছন্দে ১২, তৃতীয়তে ১০। এরপর যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেওয়া হয়। সব ভোটের পয়েন্ট যোগ করে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। পয়েন্ট সমান হলে প্রথম স্থানে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া খেলোয়াড়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিচারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও মাঠে প্রভাব। এরপর বিবেচনায় আসে দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়সুলভ আচরণ। অর্থাৎ, শুধুমাত্র গোল অথবা শিরোপা জিতলেই ব্যালন ডি’অর নিশ্চিত হয় না।
আরও পড়ুন: আইসিসির মাসসেরার মনোনয়নে সোবহানা মোস্তারি
রেকর্ডের শীর্ষে মেসি
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আটবার পুরস্কার জিতেছেন লিওনেল মেসি। ২০০৯ সালে প্রথমবার জয়ের পর তিনি ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা চারবার সেরা হন। এরপর ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও পুরস্কারটি তার হাতে ওঠে। তার পরেই পাঁচবার পুরস্কার জিতেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তিনবার করে পুরস্কার জিতেছেন ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি এবং মার্কো ফন বাস্তেন।
নারীদের ব্যালন ডি’অর ২০১৮ সালে চালু হয়। প্রথম পুরস্কারটি জিতেছিলেন নরওয়ের আডা হেগারবার্গ। এরপর স্পেনের আলেক্সিয়া পুতেয়াস এবং আইতানা বোনমাতি একাধিকবার এই সম্মান অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালে নারীদের পুরস্কারটি জিতেছেন পুতেয়াস।
২০২৬ সালে নতুন বিজয়ী কেইন
আরও পড়ুন: রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়
২০২৬ সালের পুরুষদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। প্রথমবারের মতো সোনালি বল হাতে তুলেছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, তৃতীয় স্থানে লামিন ইয়ামাল। একই আয়োজনে কোপা ট্রফি, ইয়াশিন ট্রফি, গের্ড মুলার ট্রফিসহ বিভিন্ন বিভাগে দেওয়া হয় স্বীকৃতি।
বিতর্ক, ভোটের হিসাব কিংবা তারকাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা; সবকিছুর মধ্যেও ব্যালন ডি’অরের আবেদন অটুট রয়েছে। ১৯৫৬ সালে ইউরোপের সেরা ফুটবলার খোঁজার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। প্রজন্ম বদলাবে, নতুন তারকা আসবেন, কিন্তু সোনালি বল হাতে তোলার স্বপ্ন ফুটবলারের কাছে চিরকাল রয়ে যাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন