০৪:২৮ পি.এম
মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার’ প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে এখনও সমান জনপ্রিয়। ১৯৩৭ সালে এটি যাত্রা শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে গুণগত মান, খাঁটি উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ধরে রেখে জেলার মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। জেলার অধিকাংশ মানুষের মধ্যে একজনও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি কোনো না কোনো সময় এই দোকানের মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করেননি।
বিয়ে, জন্মদিন, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা অতিথি আপ্যায়ন—সব ক্ষেত্রে মাদারীপুরবাসীর জন্য প্রথম পছন্দ হচ্ছে জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের ক্ষীরপুরি ও সন্দেশ। শুধু দেশের মধ্যে নয়, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাসরত প্রবাসীরা দেশে আসার সময় প্রিয়জনদের জন্য এখানকার মিষ্টি নিয়ে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে মাদারীপুর শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকায় একটি টিনের ছাপড়া ঘরে মণ্ডল পরিবার নির্মাণ করেন জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। মৃত রাম চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে জীবন মণ্ডল মাত্র ১২ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করেন, এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর তৈরি মিষ্টির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
সেসময় পুরাতন কোর্ট, শকুনি লেক ও আশপাশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দোকানটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে জীবন মণ্ডলের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে কানাই মণ্ডল ব্যবসার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আগের মতো সময় দিতে পারছেন না, ফলে দোকান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর ছেলে আকাশ মণ্ডল। এভাবেই তিন প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলছে।
জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি ক্ষীরপুরি ও সন্দেশ। সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে পারিবারিক আয়োজন—সবখানেই এই দুই মিষ্টির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে, শীত মৌসুমে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি সন্দেশ ক্রেতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
এছাড়াও দোকানে রসমালাই, রসগোল্লা, সাদা ছানা, চমচম, ড্রাই মিষ্টি, কালোজাম, ছানার জিলাপি, দই ও খাঁটি ঘিও পাওয়া যায়। দোকান সূত্রে জানা যায়, গ্রামের খামার থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি গরুর দুধ দিয়েই সব মিষ্টি প্রস্তুত করা হচ্ছে। বর্তমানে দোকানে পাঁচজন দক্ষ কর্মী নিয়মিত মিষ্টি তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
সবথেকে বেশি সময় ও শ্রম লাগে ক্ষীরপুরি তৈরিতে। তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় ধরে বড় কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় নাড়িয়ে মাখনের মতো ঘনত্বে এনে পরিমাণমতো চিনি মিশিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুস্বাদু ক্ষীরপুরি প্রস্তুত করা হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে মাদারীপুরের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। সারাদিনই থাকে ক্রেতাদের ভিড়। বিশেষ দিবস, বিয়ে অথবা বড় অনুষ্ঠানের জন্য আগেভাগে অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। বহু গ্রাহক কয়েক দশক ধরে নিয়মিত এখান থেকে মিষ্টি কিনে আসছেন।
দোকান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন শুধু ক্ষীরপুরিই প্রায় ২০ হাজার টাকার বিক্রি হয়। মাসে ক্ষীরপুরি বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ টাকা। অন্যান্য মিষ্টি ও ঘিসহ মোট মাসিক বিক্রি প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা হয়ে থাকে।
এখন প্রতি কেজি ক্ষীরপুরি, সন্দেশ ও সাদা ছানার দাম ৬০০ টাকা, রসমালাই ৪৫০ টাকা, চমচম, ড্রাই মিষ্টি ও কালোজাম ২৫০ টাকা, রসগোল্লা, ছানার জিলাপি ও দই ২০০ টাকা এবং খাঁটি ঘি ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক কানাই মণ্ডল বলেন, “বাবার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। ভগবানের কৃপায় এখনো মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা রয়েছে। মানের সঙ্গে কোনো আপস করিনি বলেই এত বছর ধরে সুনাম অটুট আছে।”
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস মন্তব্য করেন, “মাদারীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ এই জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। ক্ষীরপুরির স্বাদ না নেওয়া এমন মানুষ জেলায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু মাদারীপুর নয়, আশপাশের জেলাগুলো থেকেও মানুষ এখানে মিষ্টি কিনতে আসেন।”
ইতালিপ্রবাসী আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, “দেশে এলে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে এখানকার মিষ্টি খাই। বিদেশে ফেরার সময়ও ক্ষীরপুরি সঙ্গে নিয়ে যাই এবং বন্ধুদের উপহার দিই। এটি আমাদের মাদারীপুরের গর্ব ও ঐতিহ্য।”
বর্তমান পরিচালক আকাশ মণ্ডল বলেছেন, “বাবা অসুস্থ ও বয়সের কারণে এখন আমি দোকানের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই—যে মান ও ঐতিহ্যের জন্য মানুষ জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডারকে ভালোবাসে, তা ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন রাখা।”
মোট ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাদ, গুণগত মান ও আস্থার প্রতীক হয়ে রয়েছে জীবন মিষ্টান্ন ভান্ডার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা এই প্রতিষ্ঠান আজ শুধুমাত্র একটি মিষ্টির দোকান নয়, বরং এটি মাদারীপুরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গৌরবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন