০৯:০৮ এম
ক্যারিবীয় দেশ হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডবে অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, কারণ একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার পরও তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশ স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে সংঘটিত হওয়া এ ভয়াবহ হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতিসংঘ জানিয়েছে সোমবার (২৪ আগস্ট) পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে কেন্সকফ এলাকায় রাতভর এই হামলার ঘটনা ঘটে। হাইতিতে জাতিসংঘের ইন্টিগ্রেটেড অফিস জানিয়েছে, নিহত ও আহতের সংখ্যা এখনও পরিবর্তিত হতে পারে।
আরও পড়ুন: হুতিদের সৌদি আরবে একদিনে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই দেশটির রাজধানীতে ঢোকার গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা কেন্সকফে গত বছর থেকে সশস্ত্র গ্যাং প্রায় এক ডজন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার ফলে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। বড় একটি জোটের অধীনে থাকা শক্তিশালী গ্যাংগুলো দীর্ঘকাল ধরে হাইতির রাজধানীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করেছে এবং আশপাশের এলাকাতেও তা ছড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির দুর্বল পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন দেশের চেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
হাইতির মানবাধিকার সংগঠন আরএনডিডিএইচ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শুরু হওয়া হামলায় ৩০ থেকে ৪০ জন নিহত এবং ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছেন। তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
হাইতি সরকার হামলাটিকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, পুলিশ স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে মানুষজনকে হত্যা করা হলেও পুলিশ তাদের রক্ষা করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, ‘কেন্সকফকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হবে না। কোনও দুর্বলতা বা বিলম্ব ছাড়াই সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।’
এর আগে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে দুই মাস ধরে কেন্সকফে চালানো হামলায় ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ২০০টি বাড়ি ধ্বংস বা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এসব হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়াল, হুথিদের হামলার প্রভাব
এরপরও সেখানে প্রায় এক ডজন হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও গবাদিপশু চুরির মতো ঘটনাও ঘটেছে। রাস্তায় রক্তমাখা চাদরে ঢাকা তার এক আত্মীয়ের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কোরিওলান কেন্ডি বলেন, ‘আমার পরিবারও ভুক্তভোগী। কেন্সকফের মানুষ কষ্টে আছে এবং এর জন্য সরকারই দায়ী।’
আরেক বাসিন্দা ওরিসমে তার নামের শেষাংশ প্রকাশ না করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহায়তার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা অপমান আর অসহায়ত্বের মধ্যে বসবাস করছি, অথচ তারা আমাদের জন্য কিছুই করছে না।’
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার সময় বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জ্যঁ উইলিয়াম পাপের বাড়িও রয়েছে। পরে দিনের বেলায় কেন্সকফ পরিদর্শনে গিয়ে দেশটির জাতীয় পুলিশপ্রধান ভ্লাদিমির প্যারাজন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ কখনও হাল ছেড়ে দেয়নি।’
এদিকে এই সহিংসতা আগামী ডিসেম্বরে হাইতিতে নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এক দশকের মধ্যে এবারই দেশটির প্রথম নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সশস্ত্র গ্যাংগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকায় পরপর কয়েকটি সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়াল
জাতিসংঘের সমর্থনে গঠিত গ্যাং দমন বাহিনীকে দেশটির পুলিশকে গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। চলতি বছরই এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৫ হাজার ৫০০ জনের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে কেন্সকফের নিরাপত্তা জোরদারে এই বাহিনীর সদস্যদের পাঠানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনও জবাব দেয়নি বাহিনীর একজন মুখপাত্র।
উল্লেখ্য, ১৮০৪ সালে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয় হাইতি। দেশটি প্রথমে স্পেনীয় ও পরে ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ফরাসি ঔপনিবেশিকদের উৎখাত করে বিশ্বে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হয় দেশটিতে।
স্বাধীন হলেও বিগত দুই শতাব্দী ধরে দেশটি একের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, আগ্রাসন আর দমনপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছে। এর মধ্যে পরিবারতান্ত্রিক দুভেলিয়ারদের স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্বাবাদী শাসনের শিকারও হয়েছে দেশটির মানুষ।
আরও পড়ুন: প্রেমিককে বিয়ের দাবিতে ১০০ ফুট উঁচু টাওয়ারে উঠলেন তরুণী, বিয়ে করেই নামলেন
সূত্র:রয়টার্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন