১১:০৭ এম
ফ্রান্সে অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের, যারা জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত, প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ বাড়িয়ে ২১০ দিন করা হয়েছে। বিতর্কিত এই আইনটি মঙ্গলবার (১৬ জুন) ফরাসি পার্লামেন্টে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এ পদক্ষেপটি বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরো কার্যকর করার জন্য এবং জননিরাপত্তা জোরদারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলের সদস্যরা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি খর্বকারী হিসেবে গণ্য করেছেন।
ফরাসি পার্লামেন্টের সিনেটের অনুমোদনের পরে, নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিও বিলটির পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি প্রদান করে। ভোটাভুটিতে ৩৪৫ জন সংসদ সদস্য বিলটির পক্ষে এবং ১৭৭ জন বিপক্ষে ভোট দেন।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
সরকার, ডানপন্থি দলগুলো এবং কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি এই বিলটিকে সমর্থন করেছে।
বর্তমানে ফ্রান্সে প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৯০ দিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত বিদেশিদের জন্য তা ১৮০ দিন। নতুন আইনের আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ সময়সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২১০ দিন পর্যন্ত করা যাবে।
আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফরাসি ভূখণ্ড ত্যাগের নির্দেশ (ওকিউটিএফ) থাকতে হবে। এছাড়া, অতীতে গুরুতর অপরাধে অন্তত পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হতে হবে এবং তাকে জননিরাপত্তার জন্য বাস্তব ও গুরুতর হুমকি হিসেবে গণ্য করা হবে। যদি এসব শর্ত পূরণ হয়, তবে বহিষ্কার কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখতে পারবেন।
নতুন আইনে সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২১০ দিন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
বিলটি পাস হওয়ার পরে, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফরাসিদের নিরাপত্তাই আমাদের একমাত্র দিকনির্দেশনা।’
আইনটিতে একটি নতুন বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে, প্রশাসনের প্রতিনিধিরা প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক মনোরোগ মূল্যায়নের নির্দেশ দিতে পারবেন। সরকারের দাবি, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ঝুঁকি মোকাবিলায় এ ব্যবস্থা সহায়ক হবে।
তবে বিরোধীরা এ বিধানের মতো সমালোচনা করেছেন। সোশ্যালিস্ট পার্টির সংসদ সদস্য রোমাঁ এসকেনাজি এ সম্পর্কে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি মানসিক স্বাস্থ্য, সন্ত্রাসবাদ ও অভিবাসন—এই তিনটি পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে। বামপন্থি দলগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টি সাংবিধানিক পরিষদে নেওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছে।
আইনটির সমর্থক কয়েকজন সংসদ সদস্য ২০২৪ সালের আলোচিত ‘ফিলিপিন’ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত মরক্কোর একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে ফ্রান্স ছাড়ার নির্দেশ জারি ছিল এবং ঘটনার আগে তিনি একটি প্রশাসনিক আটক কেন্দ্র থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
তবে সমালোচকদের দাবি, নতুন আইন কার্যকর থাকলেও ওই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। সংসদ সদস্য অঁদি কেরব্রা বলেন, অভিযুক্তকে ৭০ দিনের মাথায় মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তার ৯০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখার সুযোগ ছিল। তাই আটকের মেয়াদ বাড়ানো হলেও ওই ঘটনার পরিণতি ভিন্ন হতো না।
ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের বহিষ্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়। তবে ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা, যা কেবল শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন লা সিমাদের মতে, ব্যক্তিস্বাধীনতায় কম হস্তক্ষেপকারী অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে কীভাবে বহিষ্কার কার্যকর করা যায় তা নিয়েই প্রশাসনিক আটক ব্যবহার করা উচিত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ বিদেশিকে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। মায়োতসহ ফরাসি ওভারসিজ অঞ্চলগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারে পৌঁছায়।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন