০২:৫৬ পি.এম
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে কিছু অর্জন তাৎক্ষণিক সাফল্যের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন একটি দেশের বৈশ্বিক অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া তেমনই একটি ঘটনা। এটি শুধুমাত্র একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় বহুপাক্ষিক কূটনীতি নতুন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, উন্নয়ন অর্থায়নের সংকট এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিতর্ক যখন তীব্র, তখন ইউএনজিএ'র মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক অভিযাত্রায় নতুন একটি অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি মূলত ঐকমত্য গঠন, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যদিও এই পদ সরাসরি কোনো নির্বাহী ক্ষমতা বহন করে না, তবুও বৈশ্বিক আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য অনেক। Bangladesh এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর মাধ্যমে এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল। প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশির এই পদে নির্বাচিত হওয়া দেশের কূটনীতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বহুপাক্ষিক পরিসরে সক্রিয় অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন।
আরও পড়ুন: নিখোঁজের ১৫ বছর পর সাবেক বাগদত্তার বিরুদ্ধে হত্যার মামলা
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) পক্ষে আন্তর্জাতিক ফোরামে নেতৃত্ব প্রদান, উন্নয়ন অর্থায়ন ও জলবায়ু কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ড. খলিলুর রহমানকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে যোগ্য করে তুলেছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে “গ্লোবাল সাউথ” ধারণাটি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণ সংকট, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আরও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো উন্নয়নশীল বিশ্বের যৌথ উদ্বেগগুলোকে আরও কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে সোচ্চার। ইউএনজিএ সভাপতিত্ব সেই কণ্ঠকে আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একইসঙ্গে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অবদান এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে অর্জিত অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এর ফলে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি ডায়াসপোরা দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে আগ্রহী। অন্যদিকে বাংলাদেশও এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন পরিবর্তন আনছে
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ, জলবায়ু অর্থায়ন, দক্ষ জনশক্তি বিনিময়, শিক্ষা সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও ইউএনজিএ সভাপতির পদ সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে না, তবুও এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সফট পাওয়ারকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের ইউএনজিএ সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশের প্রভাব কেবল তার অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে তার গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় এই নির্বাচন বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে আরও দৃশ্যমান করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তা আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই আন্তর্জাতিক মর্যাদা সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
দেশীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই অর্জনের তাৎপর্য কম নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক উপস্থিতি দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ১০০ কোটি টাকার মালিক অবসরপ্রাপ্ত সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল
লেখক: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন