০২:১০ পি.এম
স্কুলগুলো বন্ধ রয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবা আংশিকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তা অবরুদ্ধ করতে শিপিং কন্টেইনার ব্যবহার করা হয়েছে। শহরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায়, যেখানে বর্তমানে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে, তার দলের প্রাদেশিক সরকারও স্থগিত করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে এটি নতুন একটি নাটকীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, এর ফলে অস্থিতিশীলতা কমার পরিবর্তে বরং আরও বেড়ে যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানসম্মত এই পদক্ষেপটি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল প্রদেশের জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে রক্ষা করতে। দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাহ তারার গত রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘খাইবার পাখতুনখোয়ায় (কেপিকে) পিটিআই-এর সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছিল।’
আরও পড়ুন: টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি: অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে গ্রেফতার ৪
তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি বা কোনো প্রমাণও উপস্থাপন করেননি। যদিও তিনি শিগগিরই তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার দুই দিন পরেও নতুন কোনো খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু পেশোয়ার এবং এই প্রদেশের বেশিরভাগ অংশে স্কুলগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে, ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল করা হয়েছে।
পুলিশ কাউকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও, বিক্ষোভ রোধে যে একটি দমন অভিযান চলছে তা স্পষ্ট। এই প্রদেশের অধিকাংশ পিটিআই নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নিজ শহর খাইবার জেলার বারা শহরে কয়েক ডজন পিটিআই সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন। ওই এলাকায় কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
রবিবার জরুরি অবস্থা জারির এই ঘোষণার সময়টি অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে কাকতালীয় মনে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার হাজার হাজার সমর্থক খাইবার পাখতুনখোয়ায় মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছে। এই প্রদেশে পিটিআই ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ বলেন, ‘এর প্রতিক্রিয়ায় যা বলা হচ্ছে, তা বেশ কপটতাপূর্ণ শোনাচ্ছিল।’ সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার আরিফা নূর বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আমি দেখতে পাচ্ছি না। এমনকি আমি এ ব্যাপারেও নিশ্চিত নই যে, এই লং মার্চটিই এর কারণ (জরুরি অবস্থা জারি) ছিল কি না। হয়তো এটাই ছিল শেষ আঘাত অথবা হয়তো তারা বলতে চেয়েছে যে, সরকার কোনো বিরোধী দলের হাতে থাকুক, তা আমরা মেনে নিতে রাজি নই।’
আরও পড়ুন: ২ পক্ষ ১ হয়েছে, সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর
এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদি, যার অবস্থান সম্পর্কে এখনো রহস্য রয়েছে। তার দল বলছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকার বলছে সুরক্ষা হেফাজতে রয়েছেন তিনি।
পিটিআই-এর পদযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইমরান খানের তিন বোনকে সমর্থকদের সংগঠিত করাসহ অন্যান্য অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় থেকে এখনও আটক তারা।
গত এক বছরে পরিবার বা আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরান খানের খুব কমই দেখা হয়েছে। গত আগস্টে তার দুই বোন তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে, এক বোন কারাগারেই ইমরানের সঙ্গে দেখা করেন। যখন সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন আরেক বোন তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এরপরই তাকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে তিনি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি আছেন।
এই পিটিআই নেতা পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। তিনি ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি। বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। যদিও এই মামলাগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প: ইউক্রেনকে বিপুল সহায়তা দিয়েও কিছু পায়নি যুক্তরাষ্ট্র
দলটি দুর্বল হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখালো? আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র সাউথ এশিয়া ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআই-এর তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকরা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে।’
তার মতে, ‘এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সম্ভবত এখনই দলটিকে একটি অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়ার এবং তারা যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে সেই বিষয়টি তাদের জন্য আরও কঠিন করে তোলার সময় এসেছে।’
সরকার এর আগে যুক্তি দিয়েছিল, ইমরান খান কারাগারের নিয়ম লঙ্ঘন করে তার সাক্ষাৎগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ব্যবহার করছিলেন। জরুরি অবস্থা জারি প্রসঙ্গে তারার বলেছেন, ‘এর কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা উদ্দেশ্য ছিল না। তারা চাইলে তাদের পদযাত্রা বা মিছিল চালিয়ে যেতে পারত।’
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটিকে তিনি আলোচনার চেষ্টার একটি সূচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অন্যরা এটিকে ইমরান খান এবং তার দলকে সীমিত করার আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
আরও পড়ুন: ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমান অধিকার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি সরকারের: শেখ রবিউল আলম
সাংবাদিক নূর বলেন, ‘সরকারের কাছে মতবিরোধ বা ভিন্নমতের জন্য সুযোগ দিন দিন কমে আসছে এবং তারা কোনো ধরনের সংঘাত থেকে আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে চায় না।’
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন বলছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারা রয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট। ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে গেছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বেশ আত্মবিশ্বাস বোধ করছে, কারণ তাদের বিশ্বাস, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাদের একটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনায় তাদের ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
তবে, পাকিস্তানের সামনে মোকাবিলা করার মতো অনেক বড় বড় সমস্যা রয়েছে। দেশটিতে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬’, এ সন্ত্রাসবাদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান এক নম্বরে ছিল।
আরও পড়ুন: সৌদি আরব থেকেই আসতে পারে জ্বালানি তেলের পরবর্তী বড় ধাক্কা
দেশটি তার দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও বিরোধে লিপ্ত। আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এনে দেশটি বারবার আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে, যদিও তালেবান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের চাপা সংঘাতকে পুনরায় উসকে দিতে সামান্য স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট।
এদিকে, হুতিদের বিরুদ্ধে সংঘাত দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে ওঠায়, সৌদি আরবকে হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান। একটি সমস্যার সমাধান না করে এই জরুরি অবস্থা জারি আরও নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিতে পারে বলে অনেকে সতর্ক করেছেন।
এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, কারণ ইসলামাবাদকে এখন এমন একটি প্রদেশের দায়ভার নিতে হবে, যার ওপর দোষ চাপানোর মতো কোনো রক্ষাকবচ অর্থাৎ প্রাদেশিক সরকার নেই।
কুগেলম্যান বলেন, ‘আমি বলব যে এটি আসলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন, কারণ এই পদক্ষেপটি যদি সেখানকার অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয় তাহলে আপনি একটি খুব বড় সমস্যায় পড়বেন।’
আরও পড়ুন: ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমান অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার: শেখ রবিউল আলম
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন বলেন, ‘দেশ যে বহুবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, তা বিবেচনায় এটি একটি বেপরোয়া পদক্ষেপ।’ তিনি আশঙ্কা করছেন, পাকিস্তানজুড়ে এই ধরনের আরও ক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে।
এছাড়া, আরও সক্রিয় সেনা অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমনের প্রচেষ্টার নিজস্ব বিপদও থাকতে পারে বলে যুক্তি দেন চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ। তিনি বলেন, ‘যদি তারা এই অভিযানগুলো শুরু করতে যায়, তাহলে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হতাহতের ঘটনা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি সেই হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হয়, তবে তা সামরিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রশ্ন তুলতে পারে।’
সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস থাকায় পাকিস্তানের অতীতে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে প্রাদেশিক বা জাতীয়, যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা তিক্ত পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
‘এমন নয় যে পিএমএল-এন-এর (কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দল) দলের শীর্ষ নেতারা উপলব্ধি করেন না যে এই বিষয়গুলোর কিছু ভবিষ্যতে তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে’, বলেন সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার আরিফা নূর।
তিনি আরও বলেন, ‘একইভাবে আমি মনে করি, পিটিআই কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে যে, তারা বিক্ষোভ করে ইমরান খানকে বের করে আনতে পারবে না। আমার মনে হয়, আমরা যে জগাখিচুড়ির মধ্যে পড়েছি, তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিকটি হলো, আমরা সবকিছু জেনেবুঝেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি।’
সূত্র: বিবিসি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন