১১:৩৭ পি.এম
সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইকোসক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবিটি তোলা হয়েছে বাসস থেকে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন এলডিসি গ্রুপ। এ ক্ষেত্রে তারা স্বল্পসুদে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, জলবায়ু অর্থায়ন সহজপ্রাপ্য করা, বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এলডিসি গ্রুপের মত অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ ছাড়া ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং দোহা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা আসবে।
আজ সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে মৃত্যুদণ্ডের কারণ জানতে চাইল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বক্তব্যের মধ্যে তিনি টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এবং দোহা কর্মসূচির প্রতি এলডিসি গ্রুপের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তার মতে, এই দুটি বৈশ্বিক কাঠামো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল উন্নয়ন এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় সুষ্ঠু উত্তরণের গন্তব্য নির্ধারণ করে।
ড. তিতুমীর উল্লেখ করেন, যতই ২০৩০ সালের সময়সীমা কাছে আসছে, এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি ততই নির্দিষ্ট পথে থেকে সরে যাচ্ছে। বিশেষ করে এলডিসিগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা কাঠামোগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঋণের বেড়ে ওঠা बोঝা, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) এর সংকোচন, ডিজিটাল বৈষম্যের বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের সীমিত সুযোগ তাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, এসব সংকট কেবল ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নকে ব্যাহত করছে না, বরং দোহা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা-২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশি এলডিসিকে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের লক্ষ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বক্তব্যে তিনি জানান, বর্তমানে ১৪টি এলডিসি বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এ দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং বহিরাগত অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল তাদের উত্তরণ প্রস্তুতি পর্ব ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বৃদ্ধির আবেদন করেছে।
আরও পড়ুন: এনসিপি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেবে না: আখতার হোসেন
ড. তিতুমীর বলেন, দেশে ও বৈশ্বিক জটিল পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে থাকা দেশের জন্য অতিরিক্ত সময়টি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, 'স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি' (এসটিএস) বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তিনি বলেছেন, এই বাস্তবতার মধ্যে দোহা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে এলডিসিগুলোর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী বছর কাতারের দোহায় অনুষ্ঠেয় দোহা কর্মসূচির মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে নতুনভাবে শক্তিশালী করার এবং গৃহীত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তিনি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যেন এই পর্যালোচনা বাস্তবসম্মত, রূপান্তরমুখী ও কার্যকর ফলাফল দিতে পারে।
এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে তিনি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক প্রস্তাব তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিতদের ক্ষতি করতে পারবে না: খতিব আব্দুল মালেক
প্রথমত, ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমেয় এবং সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এলডিসিগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার জরুরি। এজন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধে সাময়িক স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন সহজপ্রাপ্য, পূর্বানুমেয় এবং ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অভিযোজন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর এবং 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' তহবিলের জন্য অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত ও দ্রুত প্রাপ্তিযোগ্য সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন।
চতুর্থত, সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে এলডিসিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে স্বচ্ছ, সহজ এবং উন্নয়নবান্ধব 'রুলস অব অরিজিন' নিশ্চিত করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আপিল শুনানি ১৭ নভেম্বর
পঞ্চমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য হ্রাসের জন্য আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে এলডিসিগুলো উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত করতে পারবে।
বক্তব্যের শেষাংশে ড. তিতুমীর বলেন, এলডিসিগুলোর সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সংহতি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। তিনি বলেন, দোহা কর্মসূচির মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনাকে এমন একটি মোড় পরিবর্তনের সুযোগে পরিণত করতে হবে, যা টেকসই উন্নয়নের গতি পুনরুদ্ধার করবে, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং কাউকে পেছনে না রেখে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন গতি সৃষ্টি করবে।
তিনি জানান, এ লক্ষ্য অর্জনে এলডিসি গ্রুপ সকল অংশীদারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
আরও পড়ুন: হুমায়ুনের সঙ্গে উজবেকিস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জুরাবোয়েভিচের বৈঠক, আলোচনা বাণিজ্য ও পর্যটন নিয়ে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন