০৪:০১ পি.এম
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো শুধু স্থাপত্যের কারণে নয়, বরং ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের অবিস্মরণীয় স্মৃতির জন্য যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। সৌদি আরবের তাইফ শহরে অবস্থিত মসজিদ আদ্দাস তেমন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।
প্রচলিত বর্ণনা অনুসারে, এখানেই নবী মুহাম্মদ (সা.) তাইফবাসীর নির্মম নির্যাতন ও প্রত্যাখ্যানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এখানে ঘটে যায় একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা—যা একজন খ্রিস্টান ক্রীতদাসের হৃদয়ে ইসলামের আলো প্রজ্বলিত করে।
নবুওয়তের দশম বছরে, মহানবী (সা.) প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের পর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাইফে যান। সেখানে তিনি প্রত্যাশিত সাড়া পাননি, বরং শহরের প্রভাবশালীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে।
আরও পড়ুন: শাহজালালের রানওয়ে-অ্যাপ্রোন এলাকায় যানবাহনের অবাধ চলাচল
উসকানি দিয়ে শিশু ও দুর্বৃত্তদের তাঁকে পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা পাথর নিক্ষেপ করতে করতে তাঁকে শহরের বাইরে বের করে দেয়। ফলে তাঁর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং জুতা পর্যন্ত রক্তে ভিজে যায়।
মহানবী (সা.) রক্তাক্ত ও ক্লান্ত শরীর নিয়ে শহরের অদূরে একটি আঙুরবাগানে আশ্রয় নেন।
দূর থেকে তাঁর অবস্থা দেখে বাগানের মালিকরা তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাসকে একটি থোকা আঙুর নিয়ে তাঁর কাছে পাঠান। আদ্দাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখে, তখন তিনি খাওয়ার আগে বলেন, 'বিসমিল্লাহ্' (আল্লাহর নামে শুরু করছি)। এটি শুনে আদ্দাস থমকে যান। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না। তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না। আপনি কে?' মহানবী (সা.) পাল্টা প্রশ্ন করেন, 'তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?' আদ্দাস উত্তর দেন, 'আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিষ্টান।' নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখে একটি চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, 'তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!' আদ্দাস আরও অবাক, কারণ এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানার কথা নয়। মহানবী (সা.) বলেন, 'ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।'
এই একটি বাক্য জাগিয়ে তুলেছিল আদ্দাসের ভিতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাস। সে বুঝে যায় যে, সামনে বসা মানুষটি মক্কার সাধারণ নেতা নন, বরং তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তার নিজ কিতাবেও লেখা আছে। সে নবীজির হাতে, পায়ে ও কপালে চুমু খেতে লাগলে দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলেন, 'সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিয়েছে!' ফিরে আসার পর তারা আদ্দাসকে জিজ্ঞেস করে কেন সে ওভাবে চুমু খাচ্ছিল। আদ্দাস দৃঢ়ভাবে জবাব দেন, 'এই পৃথিবীতে এই মানুষটির চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক সত্য বলেছেন, যা একজন নবী ছাড়া কেউ জানতে পারে না।'
আরও পড়ুন: বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ বিজিএমইএর উপদেষ্টার
এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। ওই আঙুর বাগানের জায়গাতেই পরে গড়ে ওঠে একটি মসজিদ—মসজিদে আদ্দাস। বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে রয়েছে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন। তাই আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদ্দাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন এবং অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন। তারা বুঝতে পারেন যে, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায় এবং চারপাশ তাড়িয়ে দেয়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা এবং একজন বিশ্বস্ত আদ্দাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন