০৩:১৪ পি.এম
রাজধানীতে ভবন নির্মাণে অনিয়ম দমন করতে রাজউকের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়ার পরও অনেকেই অবৈধভাবে পুনরায় সংযোগ গ্রহণ করেন। এরপর আদালতেরও সহায়তা নেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি বাড়ির পেছনে একজন করে পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। ভবন নির্মাণে নিয়ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতন এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা হওয়া আবশ্যক। শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) কর্তৃক আয়োজনকৃত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন তিনি। ভবন নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কাটা হলে তারা আবার চুরি করে লাগায় এবং আদালতে যান। তাহলে একটা বাড়ির পেছনে কি আমাকে একজন করে ইন্সপেক্টর নিয়োগ করতে হবে? এত লক্ষ ইন্সপেক্টর আমি কোথা থেকে পাব? এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্ল্যান বা ডিজাইন তো আপনারা প্রদান করেন, রাজউক শুধুমাত্র অনুমোদন দেয়। দুনিয়ার কোনো দেশে কি পুলিশিং করে বাড়ি তৈরি করা যায়? একটা ভবনের মিটার নিয়ে রাজউক কি করব? এটা সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়। আমরা একটি গাইডলাইন দিতে পারি। কিন্তু নির্মাতারা অবৈধভাবে পাশের বাড়ি থেকে মিটার নিয়ে আসে, অথবা মিটার হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করে নতুন মিটার নিয়ে আসে। এই পরিস্থিতি তো পাবলিক ব্যবস্থাপনার অবস্থা।’ এছাড়া তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে صرف নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর নির্ভর না হয়ে ভবন মালিক, স্থপতি, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিয়ম না মানলে রাজউকের পক্ষে প্রতিটি ভবনে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, রাজউক পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনিয়মের ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রেগুলেটরি ইস্যুতে রাজউকের দুর্বল উপস্থিতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘এই দুর্বল অবস্থান দিয়ে যে কাজ শুরু করতে পেরেছি, এটিই আমার কাছে একটি বড় অর্জন।’ ভবন নির্মাণের পুরোনো পদ্ধতির কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় শুধু আর্কিটেকচারাল প্ল্যান দিয়েই ভবন নির্মাণ হতো। ফায়ার সেফটি, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল বা স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং প্রয়োজন হতো না। এখন এসব ত্রুটি সংশোধন বা ভবন রেট্রোফিটিংয়ের দায়িত্বও রাজউকের ওপর এসেছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান। তাঁর মতে, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি শুধু ভবনের উচ্চতার ওপর নির্ভর করে না; ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা ও নির্মাণে অনিয়মও এর জন্য দায়ী। তাই অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ, মাটি পরীক্ষা ও প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। রাজউক চেয়ারম্যান জানান, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন থাকায় একসঙ্গে সব ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এজন্য ধাপে ধাপে র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট ও ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি জানান, এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের পূর্বে ঝুঁকি নিরূপণ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় গবেষণা করা হবে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে শুধু রাজউককে দায়ী করলে চলবে না। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব। ভবন নির্মাণে অনিয়ম প্রসঙ্গে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মের বিরুদ্ধে ১০ তলা করা বা নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই সংগৃহীত করা ছাড়া অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নকশায় স্বাক্ষর করেই তাঁরা দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতে তাঁদের দায়িত্ব নিতে হবে। অনিয়ম হলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনারা নিয়মের মধ্যে আসুন। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করুন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিন।’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনিয়মের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে শক্তিশালী অবস্থানে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য রয়েছে তাঁর, রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এই কাজ একদিনে সম্ভব নয়। আমি শুরু করেছি, কতটুকু সম্ভব হবে জানি না; তবে আমরা চেষ্টা করছি।’ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী। রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে গণমাধ্যমে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না। ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির উপরে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটাও জরুরি। অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একটি একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনায় ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে আরও প্রবল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। এ সময় সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদারসহ সংগঠনের সদস্য ও সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন