১২:৩৮ এম
বরিশাল মহানগরীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ত্রিশ গোডাউন এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের মাঝিদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঘটনাটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করার পর বিচারক নিজেই গোপনে ভিডিও ধারণ করেন এবং সেই ভিডিওসহ প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কোতয়ালি মডেল থানাকে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস এস. এম. শরিয়ত উল্লাহর কার্যালয় থেকে এই আদেশ জারি করা হয়। আদেশে কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একজন উপযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদী করে অবিলম্বে নিয়মিত মামলা (এফআইআর) রেকর্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ১৫ মিনিটে বিচারক ব্যক্তিগতভাবে বরিশাল মহানগরীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় তিনি পর্যটকবাহী নৌকা ও ট্রলারের মাঝিদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের ঘটনাটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। তৎক্ষণাৎ তিনি নিজের মুঠোফোনে ঘটনাটির ভিডিও গোপনে ধারণ করেন। এই ভিডিওচিত্রটিকে মামলার নথিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন প্রতিটি নৌকা ও ট্রলার থেকে ৫০ টাকা করে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে আসছে। কোনো মাঝি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে নদীতে নৌকা নামাতে বাধা দেওয়া হয়। অনেক সময় তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, গালিগালাজ এবং মারধরের শিকারও হতে হয়।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
আগে কখনো এই ঘাটে এ ধরনের চাঁদাবাজির মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। প্রতিদিনের সামান্য আয়ের একটি অংশ চাঁদা হিসেবে চলে যাওয়ায় এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ত্রিশ গোডাউন বরিশালের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী কীর্তনখোলা নদীতে নৌভ্রমণের জন্য এখানে আসেন। মাঝিদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের কারণে তারা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে বাধ্য হন। এর ফলে পর্যটকরা যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনই বরিশালের পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আদালতের মতে, চাঁদাবাজি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ কঠোর হস্তে দমন করা জরুরি।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
আদালত আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩৮৫ ধারায় ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের স্পষ্ট উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায়ও মামলা গ্রহণের পর্যাপ্ত ভিত্তি রয়েছে।
একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, তাদের সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক এবং দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম পরিচালনার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
এদিকে আদালতের এমন যুগান্তকারী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় মাঝি, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আদালতের এমন কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আইনজীবীদের মতে, কোনো বিচারক নিজে প্রত্যক্ষ করা অপরাধের বিষয়ে আইনের বিধান অনুযায়ী স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। বরিশালের এই ঘটনাটি জনস্বার্থে বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকার একটি অনন্য ও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন