০৪:১৭ পি.এম
গ্রামবাংলার শত বছরের লোক ঐতিহ্য ‘কাঠের চাকা শিল্প’ আজ বিলুপ্তির মুখোমুখি। আধুনিকতার ছোঁয়া ও সময়ের বিবর্তনে যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনের পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে। যান্ত্রিক যানবাহনের আধিপত্যের কারণে এই ঐতিহ্য আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ের আরামবাড়িয়া গ্রামের কারিগরদের শেষ প্রজন্মের হাতে কোনোরকমে টিকে আছে এই প্রাচীন শিল্পটি।
স্থানীয়দের মতে, মাত্র দুই দশক আগে আরামবাড়িয়া পদ্মাপাড়ের গ্রামগুলোতে সকাল হলেই হাতুড়ি-বাটালের খটখট শব্দ শোনা যেত। নাটোর, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা গরু ও মহিষের গাড়ির কাঠের চাকা কিনতে এখানে ভিড় জমাতেন। তখন এই পল্লীতে প্রায় অর্ধশত কারখানায় দেড় শতাধিক কারিগর দিনরাত কাজ করতেন। তবে যান্ত্রিক যানবাহনের কারণে কাঠের চাকার চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রায় সবকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে সময়ের পরিক্রমায় মাত্র পাঁচটি কারখানা কোনোরকমে টিকে আছে। স্থানীয় বিপদ চন্দ্র সরকার, অরুন সরকার, মো. ইনু, হাসেম আলী ও মাজদার হোসেন—এই পাঁচজন প্রবীণ কারিগর তাদের পরম মমতায় বহু বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আরও পড়ুন: জিয়ানগরে ইউপি নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল জলিল শেখের সমর্থকদের নিয়ে জনসংযোগ ও পথসভা
কারিগরদের মতে, তাদের পূর্বপুরুষরা বিগত প্রায় ২০০ বছর ধরে এই পেশাকে লালন করে আসছেন। বর্তমানে কর্মরত এই পাঁচ কারিগরও ৪০-৫০ বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের দক্ষ হাতে তৈরি কাঠের চাকা এক সময় এই অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের কৃষি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল। তবে কালের বিবর্তনে গরুর গাড়ির কদর কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাকা তৈরির প্রধান কাঁচামাল বাবলা কাঠের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন দশ-গ্রাম খুঁজলেও পর্যাপ্ত বাবলা কাঠ পাওয়া যায় না, আর যা পাওয়া যায় তা দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়। ফলে চাকা তৈরি করে উপযুক্ত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমানে কর্মরত পাঁচ কারিগরের সকলেই পঞ্চাশোর্ধ্ব। কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের তুলনায় আয় অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় কারিগরদের সন্তানেরা বা নতুন প্রজন্মের কেউই এই পেশায় আসতে চাইছেন না। ফলে এই পাঁচজন কারিগরের বার্ধক্যের সাথে সাথে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্পটি।
স্থানীয়রা বলছেন, একটি কাঠের চাকা কেবল কোনো যানবাহনের অংশ নয়—এটি আবহমান গ্রামবাংলার ইতিহাস, অনন্য কারিগরি দক্ষতা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। হারিয়ে যাওয়া এই লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সঠিক নথিভুক্তকরণ, ব্যাপকভাবে বাবলা গাছের চারা রোপণ, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রণোদনা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যবাহী কাঠের চাকা শিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রবীণ কারিগরদের টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।
আরও পড়ুন: চলতি বছরে ৯ মাসে ‘মব’ সহিংসতায় নিহত ১৮৭ জন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন