০৫:৫৩ পি.এম
‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে’—এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জেরা চলাকালীন প্রসিকিউশনের একজন সদস্যের দ্বারা করা হয়েছিল, যা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী মন্তব্যটিকে একপর্যায়ে ‘হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল উভয়পক্ষকে সতর্ক করেন।
রোববার (৮ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৩ নম্বর সাক্ষীকে জেরা করার সময় এই ঘটনা ঘটে।
আসামিপক্ষে সাক্ষীকে জেরা করছিলেন আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। তার সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী এবং অন্যান্য আইনজীবীরা। প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, গাজী এমএইচ তামিম এবং সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যান্যরা।
আরও পড়ুন: কাতারএনার্জি আগামী বছর ৪০ কার্গোর ২৬টি সরবরাহ করবে
জেরার এক পর্যায়ে সাক্ষীর কাছে ২০২৪ সালের হাইকোর্টের একটি রায় সম্পর্কে জানতে চান আইনজীবী পলাশ। সাক্ষী জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের ৯ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি দিয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই। একই তারিখে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করা হলেও সেটি ছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের একটি ‘মনভোলানো কৌশল’। পরবর্তীতে উক্ত মামলার শুনানির তারিখ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাক্ষী জানান যে তা তার মনে নেই।
এরপর আরও কিছু প্রশ্ন করা হলে প্রসিকিউশন থেকে আপত্তি তোলা হয়। এ সময় আসামিপক্ষের সারিতে বসা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী প্রসিকিউশনের উদ্দেশে বলেন, প্রসিকিউশনই জেরা করুক, আমরা বসে যাই। ট্রাইব্যুনাল মুনসুরুল হককে ডায়াসে এসে কথা বলতে বললে তিনি অভিযোগ করেন, প্রসিকিউশন থেকে কেউ দাঁড়িয়ে গেলে সাক্ষীর মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায় এবং তিনি সতর্ক হয়ে যান, যার ফলে সত্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে সম্পর্কিত আইন পড়ে শোনান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
আইন পড়া শেষে পুনরায় জেরা শুরু হলে কাঠগড়ায় বসা সাক্ষীকে উদ্দেশ্য করে আসামিপক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রসিকিউশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিন। সাক্ষী ‘ঠিক আছে, তাহলে আমি সরে যাই’ বলে তার চেয়ার ঘুরিয়ে নেন। সাক্ষীর এমন আচরণ দেখে প্রসিকিউশনের একজন সদস্য বলেন, ‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে’।
এতে ডায়াসে দাঁড়ানো আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় আপত্তি জানিয়ে বলেন, তাহলে আমার জেরা করা ঠিক হবে না, এটি এক ধরনের থ্রেট। এ নিয়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হলে ট্রাইব্যুনাল হস্তক্ষেপ করে দুই পক্ষকেই শান্ত ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: শেয়ারের নামে অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধ হোক : রিহ্যাবের দাবি
পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর আইনজীবী পলাশ আবার জেরা শুরু করে ৯ জুলাই কোনো সহিংসতা হয়েছিল কি না জানতে চান। সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহিংসতা হয়নি; তবে বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল।
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ আদালত আমলে নেন।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রথমটিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে মূল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই ফোনালাপে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের আজ রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে শেষ করে দেওয়ার কথা বলেন। তাদের প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের কারণে বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ হারালেও নির্যাতন বন্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, তাদের প্রত্যক্ষ জানা ও উসকানিতে ২৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডাররা।
আরও পড়ুন: বরিশালে দুই অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিলো পরিবেশ অধিদফতর, বাধা দেয়ায় আটক ১
তৃতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন এই দুই প্রভাবশালী। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের উসকানি ও প্ররোচনায় ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ আকাশ, সেতু ও আলভীসহ মোট ১২ জনকে হত্যা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
আর পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ব্যর্থ করতে পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাদের নির্দেশে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের হামলায় মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির ও রিতাসহ ১৬ জন হত্যার শিকার হন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন