১১:৪২ এম
ঢাকা, ২৮ জুলাই, ২০২৬ : সরকারের ঘোষিত অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অপরাধ দমন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সম্প্রসারণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনআস্থা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এসব উদ্যোগের আওতায় কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, পেশাগত সংস্কার এবং একাধিক সংস্থার সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, অপরাধ এবং মাদক পাচার দমনে পুলিশ নিয়মিত টহল, রুটিন অভিযান এবং বিশেষ দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতৃত্বে নাঈম ও ইমরান
তিনি বলেন, 'অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে সারা দেশে অপরাধ দমনে আমরা সর্বাত্মক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক সাড়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ মে থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত ও দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে মোট এক লাখ ১৬ হাজার ৭২৫ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর মধ্যে বিশেষ অভিযানে ৩২ হাজার ৯০৮ জনকে এবং বিভিন্ন মামলায় যাতে নিয়মিত পুলিশি অভিযানে আটক করা হয়েছে ৮৩ হাজার ৮১৭ জনকে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ডাকাতির শিকার ৫০-৬০ যানবাহন, লুট ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা
দেশব্যাপী অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক এবং দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ২৪৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি, ৮৮টি ম্যাগাজিন, ৪৩টি দেশীয় বিস্ফোরক, ২ কেজি গানপাউডার, ৫০৩টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং ১০ হাজারের বেশি দেশীয় ‘চকলেট বোমা’।
উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৭৬টি পিস্তল, ৫০টি বন্দুক, ৩৩টি এলজি, ৩০টি শুটার গান, ১৮টি রিভলভার, ১৫টি পাইপগান, ৪টি শটগান, ২টি রাইফেল, ২টি সাবমেশিনগান (এসএমজি), ১২টি এয়ারগান এবং একটি পেনগান।
একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক মাদকবিরোধী অভিযানও পরিচালনা করেছে। অভিযানে প্রায় ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮ হাজার ২৮৪ প্যাকেট হেরোইন, ৩ হাজার ১৮৬ বোতল ফেনসিডিল, ৬ হাজার ৮৩৫ বোতল বিদেশি মদ, ৩৫৪ বোতল দেশীয় মদ, ৫ হাজার ৩৩৬ প্যাকেট গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে মা ইলিশ সংরক্ষণে নৌবাহিনীর অভিযান, জাল জব্দ
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ সময় মাদক-সংক্রান্ত ১৪ হাজার ১৫৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মাদক-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ২০ হাজার ৪৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে দেশব্যাপী অপরাধবিরোধী কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।
কর্মকর্তারা জানান, সরকারের চলমান জোরদার পুলিশি তৎপরতা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পুলিশ বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও মাদকচক্র ভেঙে দেওয়া, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জে ভোজ্য তেলে পরিমাণে কারচুপি ও মোড়কজাতকরণে অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককে সিসিটিভি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এ নজরদারি ব্যবস্থা মহাসড়কে ডাকাতি, মাদক পাচার ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি যান চলাচল ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সহায়তা করবে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ বাসসকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পুরো অংশ এখন সিসিটিভির আওতায় রয়েছে এবং ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এআইচালিত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পুরো অংশকে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।'
আরও পড়ুন: ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা বনানী থেকে গ্রেপ্তার
তার মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ডাকাতি, মাদক পাচার ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির অংশ এবং পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও সম্প্রসারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকার কঠোর ও আইনসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার দেশে শান্তি, জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আরও পড়ুন: ২৫টি সরকারি জলমহাল ৬ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত
মন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দেশে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।'
তিনি জানান, এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশ বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, সারাদেশে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিত ও ব্যাপক কৌশল বাস্তবায়ন করছে।
জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হত্যা-সহ সব ধরনের অপরাধ কঠোরভাবে আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হবে।
তিনি বলেন, 'আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রুত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, ঢাকা শহরে নিরাপদ ট্রাফিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ধাপে ধাপে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।'
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে গত ১ মে থেকে মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
এ অভিযানে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অংশ নিচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, এ অভিযানের মূল লক্ষ্য বড় মাদকচক্র ধ্বংস, আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং সমন্বিত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ অপরাধ নির্মূল করা।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির পুলিশ সদস্যদের অপরাধ দমনে কঠোর থাকার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে আচরণে ভদ্রতা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদও সাম্প্রতিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে নিজ নিজ দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, 'অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা সামাজিক পরিচয় নেই। পুলিশকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত না করে জনগণের সেবা করতে হবে।'
কমিশনার অবৈধ অস্ত্রধারী, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান আরও জোরদারের পাশাপাশি নিজ নিজ থানার এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেওয়া কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হবে। অন্যদিকে দায়িত্বে অবহেলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ বা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলমান অপরাধ দমন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গড়ে প্রায় ৪০০ জন অপরাধ-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন