০৬:৪২ পি.এম
আল-জাজিরার শিক্ষানবিশ সাংবাদিক দল- (বাঁ থেকে) জেনিফার নেহরার, রিও, জ্যাকসন মিলস ও সাশা রিউ। ছবি: আল-জাজিরা থেকে সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর (ইউসিএসডি) মৃতদেহ দান কর্মসূচি ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, শিক্ষা ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য দান করা মৃতদেহ মার্কিন নৌবাহিনী ও বিদেশি সামরিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক সার্জনদের প্রশিক্ষণের বিষয়ও রয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর দাতাদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, মৃতদেহ দানকারীরা এমন ব্যবহারের বিষয়ে আগে থেকে অবহিত ছিলেন না।
আরও পড়ুন: ব্রিটেনে অভিবাসীদের ধরতে জনসমাগমে মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা
নেভাডায় কর্মরত মেডিকেল কেস ম্যানেজার মিরিয়াম ভলপিন জানান, সম্প্রতি তিনি এক বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে পারেন, যেখানে দাবি করা হয়- ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় দানকৃত মৃতদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে।
ভলপিনের ১০১ বছর বয়সী মা জিনেট ভলপিন ২০২১ সালে মারা যান এবং তার মরদেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় দান করা হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তার মায়ের মরদেহ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, "এটা শুনে আমি অসুস্থ বোধ করেছি। আমরা কখনওই জানতাম না এমন কিছু হতে পারে।"
আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানী ডকুমেন্টারি সিরিজ ‘ডিরেক্ট ফ্রম’-এ উঠে আসে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মৃতদেহ সরবরাহ করে আসছে, যা সামরিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুন: আজ বাংলাদেশে প্রথম নারী চিকিৎসক জোহরা বেগম কাজীর মৃত্যুবার্ষিকী
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া অন্তত ৮৯টি মৃতদেহ নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো থেকে প্রায় ১২৪টি মৃতদেহ ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থানান্তর করা হয় বলে শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের তদন্তে জানা গেছে।
একটি ২০২০ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়, প্রশিক্ষণের সময় মরদেহে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো, যাকে ‘পারফিউশন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মরদেহে কৃত্রিম রক্ত প্রবাহিত করা হয়, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের মতো বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করা যায়।
প্রশিক্ষণে গুলিবিদ্ধ হওয়া, বিস্ফোরণজনিত ক্ষতি এবং গুরুতর আঘাতের মতো দৃশ্য অনুকরণ করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আমেরিকান নৌবাহিনী দাবি করেছে, এটি একটি উচ্চমানের চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে অভিজ্ঞ সার্জনরা বাস্তবসম্মত পরিবেশে দক্ষতা অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাবি করছে, এই কার্যক্রম শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, দাতাদের পরিবারকে সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকে জানানো হয়নি।
আরও পড়ুন: ইয়েমেনের বাজারে সৌদি জোটের বিমান হামলায় ৩০ জন নিহত
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসক মোহাম্মদ রাদ প্রশ্ন তোলেন- দাতারা যদি জানতেন যে তাদের মরদেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে তারা কি এই সিদ্ধান্ত নিতেন?
তিনি বলেন, "সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দাতারা কি সত্যিই এ সম্পর্কে সম্মতি দিয়েছিলেন?"
অনেক পরিবার এখন দাবি করছেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন। মরদেহ দানকারী এক পরিবারের সদস্য জেনিফার গোমেজ বলেন, তিনি আগে জানতেন না যে মৃতদেহ বিদেশি সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনি বলেন, "আমি কখনও ভাবিনি আমাদের পরিবারের মরদেহ এভাবে সামরিক কাজে ব্যবহার হতে পারে।"
আরও পড়ুন: ইরানের পরমাণু কর্মসূচির তথ্য পেতে যুক্তরাষ্ট্র ২০ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা
এই ঘটনার পর অনেক সম্ভাব্য দাতা তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন বলেও জানা গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো জানিয়েছে, তারা এটিকে ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’ হিসেবে না দেখে ‘শিক্ষামূলক কোর্স’ হিসেবে বিবেচনা করে। তবে আল-জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ব্যবহারের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।
এদিকে মার্কিন নৌবাহিনী ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই কর্মসূচি চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে- মৃতদেহ দান কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত করা হয় এবং দাতাদের সম্মতি আসলে কতটা পূর্ণাঙ্গ?
আরও পড়ুন: স্বর্গের লোভ দেখিয়ে শিশুদের অনাহারে হত্যা, কেনিয়ার ধর্মগুরুকে ২০০ বছরের সাজা
মানবাধিকারকর্মী ও গবেষণার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা শিক্ষার জন্য মরদেহ দান গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে পূর্ণ স্বচ্ছতা না থাকলে এটি নৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন