০৪:৫৫ পি.এম
শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুইজন, আর শিক্ষক পাঁচজন। কোথাও দেখা যাচ্ছে, পাঁচ শিক্ষার্থীর জন্য একাধিক শিক্ষক নিয়োজিত আছেন, আবার কোথাও দুপুরের পর শ্রেণিকক্ষ একেবারেই ফাঁকা। কোনো বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় শিক্ষকদের স্বাক্ষর থাকলেও কর্মস্থলে তাদের উপস্থিতি নেই। বরগুনার সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে শিক্ষকের অনুপস্থিতি, একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একই কক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার নিম্নমানের অভিযোগের কারণে। বিদ্যালয় ভবন রয়েছে, শিক্ষক পদও মঞ্জুর হয়েছে; কিন্তু শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। ফলে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সরকারি বিদ্যালয় ত্যাগ করে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকছেন।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রে এমন উদ্বেগজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে। বরগুনা সদর উপজেলার মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান সুন্দর ভবন ও সাজানো শ্রেণিকক্ষ থাকলেও শিক্ষার্থী মাত্র দুজন। পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে তিনজন উপস্থিত ছিলেন। প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। পাশের চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচজন। সেখানে দুই শিক্ষিকা উপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যার এই অসামঞ্জস্য কেবল জনবল ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, বরং বিদ্যালয়ের কার্যকারিতা, পাঠদানের পরিবেশ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, আশপাশে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং অভিভাবকদের পছন্দ পরিবর্তনের বিষয়ও রয়েছে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফ হত্যা: দুর্গাপুরে অপূর্ব নামের যুবক গ্রেপ্তার
আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে বেতাগীর পূর্ব হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চারজন শিক্ষকের মধ্যে দুজন উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে খালি শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ হাজিরা খাতায় চারজন শিক্ষকের স্বাক্ষর ছিল। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে একসঙ্গে পাঠদান করছিলেন একজন শিক্ষক। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যক্রম কতটা আয়ত্ত করতে পারছে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
দুপুর আড়াইটার দিকে উত্তর দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাত্র একজন শিক্ষক। পাশের চানমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থী উপস্থিতির চিত্র ছিল প্রায় একই রকম। দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীশূন্য থাকার ঘটনা নিয়মিত কি না, তা যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অভিভাবক মহলের।
বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিক্ষকদের কেউ যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কেউ মাদ্রাসার প্রসার, আবার কেউ কিন্ডারগার্টেনের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহের কথা বলেছেন। তাঁদের মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রাক্-প্রাথমিক থেকেই ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি স্কুলকে দেখার প্রবণতাও অভিভাবকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ আরও সরাসরি। তাঁদের মতে, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, দুর্বল পাঠদান, নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ত্যাগ এবং তদারকির ঘাটতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। সন্তানের ভালো শিক্ষার প্রত্যাশায় বাড়তি খরচ করেও কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করছেন অনেকে। কিছু অভিভাবককে সন্তানদের পড়াতে কয়েক কিলোমিটার দূরের প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হচ্ছে। তাঁদের মতে, সরকারি বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে এভাবে শিক্ষার্থী হারানোর প্রবণতা কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফের পরিবারকে ১ লাখ টাকা সহায়তা, স্ত্রীকে চাকরির আশ্বাস ডেপুটি স্পিকারের
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ১ হাজার ৪৫টি। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয় ৭৯৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৮১ হাজার ৯০০ জন। শিক্ষক পদ মঞ্জুর রয়েছে ৫ হাজার ৪৭টি।
মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার বলেন, এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিক্ষার্থীরাও ভাগ হয়ে যাচ্ছে। চরপাড়া বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. পারভীন জানান, শিক্ষার্থী কম হলেও শিক্ষকদের পুরো সময় বিদ্যালয়ে থাকতে হয়, পাশাপাশি শিক্ষকসংকটের সমস্যাও রয়েছে।
সচেতন এলাকাবাসী জানান, শিক্ষার্থী ধরে রাখতে এখন শুধু ভর্তি কার্যক্রম বা অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নিয়মিত ও শ্রেণিভিত্তিক পাঠদান, শূন্য পদ পূরণ, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং কার্যকর তদারকি জোরদার করতে হবে। হাজিরা খাতা ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে অসংগতি থাকলে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার্থী উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার এবং শিখনফল প্রকাশের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষার প্রধান ভরসা। সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি, দুর্বল পাঠদান ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়মিত চিত্র হয়ে ওঠে, তবে একটি প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরগুনার প্রাথমিক শিক্ষায় সংকট তাই শুধু শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নয়, এটি শিক্ষার মান, প্রশাসনিক তদারকি ও জনআস্থার সংকট। এখন প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের এই বাস্তবতা বদলাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে প্রেমের টানে বাংলাদেশে এলেন চীনা যুবক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন