মঙ্গলবার, ১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০২:৫৯ এম
দীর্ঘ ১৫ বছরের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ২০১১ সাল থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ৩১ আগস্ট এই পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন টিম কুক। সিইও হিসেবে নিজের শেষ দিনে অ্যাপল সম্প্রদায়কে এক আবেগঘন বার্তায় ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে টিম কুক লেখেন, সিইও হিসেবে শেষ দিনে অ্যাপল সম্প্রদায়কে অনেক ভালোবাসা। আগামীকাল আমার পদবি বদলে যাবে, কিন্তু আপনাদের প্রতি আমার ভালোবাসা কখনোই বদলাবে না। নিরন্তর অনুপ্রেরণার উৎস হওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই এবং আমি নতুন অধ্যায়ের জন্য দারুণ রোমাঞ্চিত!
তার এই পোস্টে শুভকামনা ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন অসংখ্য ভক্ত-অনুসারী।
সিইও পদ ছাড়লেও অ্যাপল থেকে একেবারে বিদায় নিচ্ছেন না কুক। এখন থেকে তিনি কোম্পানির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে, ১ সেপ্টেম্বর (২০২৬) থেকে অ্যাপলের নতুন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জন টার্নাস।
স্টিভ জবসের বিদায়ের পর কুক যখন দায়িত্ব নেন, তখন অনেকেই তার সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের দক্ষতায় সব সংশয় দূর করেছেন। তার নেতৃত্বে অ্যাপলের বাজারমূল্য ৩৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ১৩ ডলারের শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৯.৭০ ডলারে, আর বার্ষিক আয় ১০৮ বিলিয়ন থেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। শুধু আইফোনের মতো হার্ডওয়্যার নয়; অ্যাপ স্টোর, অ্যাপল মিউজিক ও অ্যাপল পে-এর মতো সার্ভিস খাতেও কোম্পানিটিকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছেন টিম কুক।
বিডিপ্রতিদিন/কেকে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
‘আমি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি, এখন আর দেওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই’ বলে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে সোমবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেন লিওনেল মেসি। অধিনায়কত্ব করে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২১ ও ২০২৪ সালে দলকে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতিয়েছেন তিনি।
কিন্তু বিখ্যাত সেই আকাশী-সাদা জার্সিতে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময়টি দেখা থেকে বিশ্ব প্রায় বঞ্চিতই হতে বসেছিল।
২০১৬ সালের ২৬ জুন, রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আক্ষরিক অর্থেই একটি গোটা দেশের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিলেন মেসি।
নিজের ২৯তম জন্মদিনের ঠিক দুদিন পর এবং কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পরপরই মেসি সিদ্ধান্ত নেন—অনেক হয়েছে, আর নয়।
১১৩টি ম্যাচ খেলার পর তিনি নিজের সিদ্ধান্তে ছিলেন একেবারেই অনড়। মনের ভেতর তিনি পণ করে নিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আর কখনোই মাঠে নামবেন না।
চোখের জল সামলে ট্রফি জয়ের আরও একটি সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর মেসি বলেছিলেন, জাতীয় দল নিয়ে আমার অধ্যায় এখানেই শেষ। আমি সাধ্যমতো সব চেষ্টা করেছি। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার বেদনা সত্যিই ভীষণ কষ্টের। আমি এটাই সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম, কিন্তু পেলাম না। তাই আমার মনে হয়, এটাই সবার জন্য সেরা সিদ্ধান্ত।
মেসির সেই আবেগ ও কষ্ট বোঝার মতো ছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পাশাপাশি ২০০৭, ২০১৫ এবং ২০১৬—টানা চারটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বসেরা হিসেবে যাকে মানা হতো, দেশের হয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতেই তিনি বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
ভাগ্য ভালো আর্জেন্টিনার, মেসি পরবর্তীতে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেছিলেন।
পরবর্তী ১০ বছরে তিনি তৈরি করেছেন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রূপকথা। তবে এটি এমন এক দশকের আধিপত্য ছিল, যা প্রায় শুরুই হতে পারত না।
অবসরের সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পর, মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে আরও ৯৪টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ৭০টি গোল করেছেন। জিতেছেন চারটি প্রধান ট্রফি।
২০১৬ সালের জুনে অবসরের ঘোষণা দেওয়া থেকে শুরু করে আগস্টের ১২ তারিখে দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে আবার ফিরে আসার মাঝের এই ছয় সপ্তাহ—আর্জেন্টাইন ফুটবল, এমনকি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গণ্য হতে পারে।
‘নেতা হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব তার নেই’
মেসি যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ ছাড়ছেন, তখন ১০ বছর আগে দেশটির আরেক কিংবদন্তি ১০ নম্বর জার্সিধারী মারাদোনার দেওয়া এক সমালোচনামূলক মন্তব্য এখন প্রায় হাস্যকর ঠেকে।
মেসির প্রথমবার অবসরের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে দিয়েগো মারাদোনা বলেছিলেন, সে মানুষ হিসেবে সত্যিই খুব ভালো, কিন্তু তার কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। নেতা হওয়ার মতো যে স্বভাব বা তেজ দরকার, সেটা তার নেই।
তখনকার দিনে মারাদোনার সঙ্গেই সবসময় তার তুলনা টানা হতো এবং সেটা মেসির বিরুদ্ধেই যেত। অথচ ২৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই বার্সেলোনার হয়ে ৮টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ৫টি ব্যালন ডি'অর জিতে ফেলেছিলেন মেসি।
ক্লাব ক্যারিয়ারে মারাডোনা এর ধারেকাছেও ছিলেন না, কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেসির ঝুলিতে তখন একমাত্র বড় সাফল্য বলতে ছিল কেবল ২০০৮ অলিম্পিকের সোনা। অন্যদিকে মারাদোনা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন সেই পরিবেশ কল্পনা করাও কঠিন। যেখানে গত দুটি বিশ্বকাপে গ্যালারিজুড়ে শুধুই মেসির জার্সি, পুরো দলটা তৈরি হয়েছিল তাকে কেন্দ্র করে এবং ভক্তরা তাকে প্রায় দেবতার মতো পুজো করে—সেখানে সেই সময় তাকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
সে দিয়েগোর মতো অতটা ভালো নয়, বড় কোনো ম্যাচে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, দেশের সব ব্যর্থতার পেছনে সে-ও দায়ী—এমন নানা অভিযোগে তাকে জর্জরিত করা হতো।
জাতীয় দল ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা মেসি যে সেবারই প্রথম করেছিলেন, তা কিন্তু নয়।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও মেসির জীবনীকার গিলেম বালেগে বলেন, হেরে গেলে লিও ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভেঙে পড়ে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার মানসিক চাপ এবং মারাদোনার সাথে প্রতিনিয়ত চুলচেরা বিশ্লেষণ—এসব সে তীব্রভাবে অনুভব করত।
তিনি আরও যোগ করেন, আর্জেন্টিনায় মানুষ তাকে বলত পেচো ফ্রিও (Pecho Frio), যার অর্থ ঠান্ডা বুক। রক্তে তেজ নেই বা শিরার ভেতরে রক্ত না থেকে যেন দুধ বইছে—কাউকে অপমান করার জন্য সেখানে এই কথাটি বলা হতো। তাই ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় ব্যর্থ হওয়ার পর, সেটি ছিল তৃতীয় ঘটনা (তবে প্রথমবার জনসমক্ষে), যখন সে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আগের দুবার সে নিজের ভেতরের ক্ষতগুলোকে গোপনে সারিয়ে তুলেছিল, কিন্তু সেবার সে প্রকাশ্যে এসে বলে দেয় যে সে আর পারছে না। অনেক সময় মেসি নিজেকে ধরে রাখতে পারে না, যা ভাবে তা বানিয়ে না বলে সরাসরি বলে ফেলে।
তবে মারাডোনা বনাম মেসির সেই বিতর্ক এখন নির্দ্বিধায় শেষ। সিংহভাগ মানুষের মতেই মেসিই এখন আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা। এমনকি অনেকে তো তাকে পেলের সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে রাখছেন।
একটি প্রচারণা, একটি ভাস্কর্য এবং অজস্র ক্ষমা প্রার্থনা
এমনকি যারা একসময় মেসির কড়া সমালোচনা করেছিলেন, তারাও শেষমেশ তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। মেসি জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া মাত্রই পুরো আর্জেন্টিনাজুড়ে যেন এক বিশাল ধাক্কা বা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।
হ্যাঁ, তিনি টানা চারটি ফাইনালে হেরেছিলেন ঠিকই। কিন্তু দিনশেষে তিনিই ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং বিশ্বের সেরা ফুটবলার।
মেসিকে জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনার জন্য 'গেট মেসি ব্যাক' আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। তিনি অবসর নেওয়ার কথা জানানোর মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় সতীর্থরা তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অনুরোধ জানান।
যেমন গোলরক্ষক সের্হিও রোমেরো বলেছিলেন, মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার জাতীয় দল আমি ভাবতেই পারি না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় `#NoTeVayasMessi` (যেও না মেসি) হ্যাশট্যাগটি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০,০০০ বারেরও বেশি ব্যবহার করা হয়।
বার্সেলোনা তারকাকে সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে বোঝাতে ততক্ষণে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাউরিসিও মাক্রি নিজে ফোনে মেসির সঙ্গে কথা বলেন।
সে সময় সাংবাদিকদের মাক্রি বলেছিলেন, আমি তাকে বলেছি যে কে কী বলছে তাতে কান না দিতে, কারণ সে যে কাজ করেছে তাতে আমরা সত্যিই অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।
এর একদিনের মধ্যেই বুয়েনস আইরেসের মেয়র হোরাসিও রদ্রিগেজ লারেতা মেসির সম্মানে একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি উন্মোচন করেন এবং সাধারণ মানুষকে তাদের ভালোবাসা জাহির করার আহ্বান জানান।
মেয়র আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে, লিও, আমি তোমাকে বিনীত অনুরোধ করছি—দয়া করে তোমার সিদ্ধান্তটি আরেকবার ভেবে দেখো।
মধ্য বুয়েনস আইরেসে হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন, আর রাজধানীজুড়ে রাস্তার সংকেত চিহ্নগুলোতে ভেসে উঠছিল একটাই আকুতি—আর্জেন্টিনার হয়ে যেন মেসি খেলা চালিয়ে যান।
এমনকি মারাদোনাও নিজের সুর বদলে বলেন, ২০১৮ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দলকে টেনে নেওয়ার জন্য মেসিকে দলে থাকতেই হবে।
সেটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল, আমরা তাকে কতটা ভালোবাসতাম
কোপা আমেরিকার ব্যর্থতার পর জেরার্দো মার্তিনোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ২০১৬ সালের অগাস্টে আর্জেন্টিনা দলের কোচ হন এদগার্দো বাউসা। কোচ হিসেবে তিনি মাত্র আট মাস স্থায়ী হয়েছিলেন, তবে তার দায়িত্বকালের প্রথম কয়েকটা দিনই হয়তো ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো সোজা বার্সেলোনায় উড়ে গিয়ে মেসিকে মন বদলাতে রাজি করানো। দেশজুড়ে মেসিকে ফেরানোর সেই বিশাল আকুল আবেদন মেসি আর উপেক্ষা করতে পারেননি।
জাতীয় দলে ফেরার কথা জানিয়ে মেসি বলেছিলেন, আমি এই দেশ এবং এই শার্টটাকে বড্ড ভালোবাসি।
তিনি আরও বলেন, যারা চেয়েছিলেন আমি যেন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা চালিয়ে যাই, তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি, খুব শীঘ্রই আমরা তাদের মুখে হাসি ফোটানোর মতো কিছু দিতে পারব।
তবে সাফল্য কিন্তু রাতারাতি আসেনি। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা, আর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে মেসির ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন বুঝি চিরতরে শেষ।
কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে, ৩৪ বছর বয়স হওয়ার আগে মেসি দেশের হয়ে কোনো সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফি জিততে পারেননি, আর সেখান থেকেই মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তিনি পরপর চারটি বড় ট্রফি জিতে নেন—যার মধ্যে ২০২২ সালের ফিনালিসিমাও রয়েছে।
প্রতিটি ট্রফি জয়ের পরই তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে, কিন্তু তিনি খেলা চালিয়ে গেছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। ২০২৬ সালের সেই বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পথেও তিনি ৮টি গোল করেন এবং ৪টি অ্যাসিস্ট যোগ করেন।
মাঠে তাকে কেবল ধীরপায়ে হেঁটে বেড়াতে দেখা যাচ্ছিল, আগের সেই দ্রুত গতি আর হয়তো ছিল না, কিন্তু তিনি প্রতিটিতে মুহূর্তেই সমান কার্যকর প্রমাণিত হয়েছেন।
২০২৬ সালের এই ফাইনালটি আয়োজিত হয়েছিল ঠিক সেই স্টেডিয়ামেই, যেখানে ১০ বছর আগে এক হতাশার রাতে মেসি প্রথম 'অবসর' নিয়েছিলেন।
২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের দিনে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকা আর্জেন্টিনার সমর্থক বেঞ্জামিন বলেন, ১০ বছর আগে মেসি যখন অবসর নিয়েছিল, তখন তা আমাদের সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে আমরা তাকে কতটা ভালোবাসি। যখন শুনলাম সে অবসর নিচ্ছে, আমি কেঁদেছিলাম, পুরো দেশ কেঁদেছিল। সে সমালোচনা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা কেবল এই কারণেই যে সবাই তাকে বড্ড বেশি ভালোবাসত ও তার কাছে অনেক প্রত্যাশা রাখত। লিওনেল মেসি না থাকলে, ১৯৮৬ সালের পর পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য আর্জেন্টিনাকে হয়তো আজও পথ চেয়ে বসে থাকতে হতো।
এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই মেসির বাবা হোর্হের প্রয়াণ ঘটে, যার ফলে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
তবে ৩৯ বছর বয়সে এসে এবার তার নেওয়া এই বিদায়ের সিদ্ধান্তটি একেবারেই চূড়ান্ত বলেই মনে হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার আর কোনো নতুন প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তবে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশেষজ্ঞ টিম ভিকারি মনে করছেন, আর্জেন্টিনায় মেসির জন্য একটি অফিসিয়াল বা রাজকীয় বিদায়ী ম্যাচের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
বিবিসি রেডিও ৫ লাইভ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভিকারি বলেন, মনে রাখবেন, বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের আচরণের কারণে শাস্তি হিসেবে আর্জেন্টিনার মাটিতে খেলা পরবর্তী ম্যাচটিতে কেবল ৫০% দর্শক প্রবেশের অনুমতি থাকবে। কিন্তু সেই শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিতভাবেই চিন্তা করবে: কেন বুয়েনস আইরেসে আমরা একটি বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন করছি না? রিভার প্লেটের স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা পুরো দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কেন আমরা সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বিদায় জানাচ্ছি না? কেমন হয় ভাবনাটা, লিও? শেষবারের মতো আর একটিবার?
সূত্র: বিবিসি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
তিব্বত ও নেপাল সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী বন্যা ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে আবারও কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ঠিক এমন একটি সময়ে এই বিপর্যয়টি ঘটল, যখন এ অঞ্চলের দেশগুলো তীব্র গতিতে এই অতি-উচ্চতাকোলের দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোতে নিজেদের অবকাঠামোগত বিস্তার বাড়িয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে উভয় সীমান্তে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। যদিও এই নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সরাসরি মানবসৃষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কোনো সংযোগের প্রমাণ মেলেনি তবুও উদ্ভূত এই বিধ্বংসী পরিস্থিতি সেইসব দেশের সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের বাস্তবতার ধাক্কা হতে পারে, যারা হিমালয় জুড়ে জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে বাঁধ, টানেল, মহাসড়ক, রেলপথ ও সেতু নির্মাণের এক বিশাল প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এই অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রযাত্রায় কোনো দেশই চীনের মতো বিশাল পরিসরে উদ্যোগ নেয়নি। বেইজিংয়ের কাছে তিব্বত এবং এর হিমালয় সীমান্ত এলাকা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয় বরং জাতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। চীন সরকার এই অঞ্চলটিকে সবুজ শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা ১৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল মেগা-বাঁধ নির্মাণ করছে, যা মানব প্রকৌশলবিদ্যার পূর্ববর্তী সমস্ত সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে এই দৌড়ে চীন একা নয়। ভারত এবং কিছুটা কম পরিসরে হলেও নেপালও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবকাঠামো তৈরির খেলায় মেতে উঠেছে। পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, ভূমিকম্পপ্রবণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা এই অঞ্চলে দেশগুলো কোটি কোটি ডলার ঢালছে। কিন্তু গত বুধবার সকালে প্রকৃতির সেই ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা আরও একবার নিষ্ঠুরভাবে দৃশ্যমান হয়, যখন পাহাড়ের একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ে শক্তিশালী ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এর ফলে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত বিশাল এলাকা জুড়ে ভবন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং গ্রাম, রাস্তাঘাট, সেতু ও একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়, যার চূড়ান্ত মানসিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাব করা সম্ভব হয়নি।
দুর্যোগের পর থেকে উভয় সীমান্তেই উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদ ভেঙে পুনরায় বন্যা ও ভূমিধসের মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্যোগের তীব্র হুমকি তৈরি হয়েছে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্ধার ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একাধিক হিমবাহ, হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ, সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি এবং পরিবর্তনশীল আবহাওয়াকে চরম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, নেপালে রবিবারও উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ থাকা ৯০০ জনেরও বেশি শ্রমিকের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন এবং প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন।
হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর এই বিশাল অবকাঠামোগত স্বপ্ন পূরণের পথে এই মহাপরিপর্যয় কোনো সতর্কবার্তা বা ঘুম ভাঙার মতো ঘটনা হিসেবে কাজ করবে কি না, তা নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার ভয়াবহতা এবং এটি একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তে ঘটে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাকারীদের এখন আরও গভীর সতর্কতার সাথে ভাবা উচিত যে তারা কীভাবে এই অঞ্চলে প্রকল্পগুলোর নকশা, অবস্থান ও আকার নির্ধারণ করবেন। পাশাপাশি এটি যৌথ ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার জন্য একটি আঞ্চলিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিন দিন আরও চরম এবং অননুমেয় রূপ নিচ্ছে।
উড্রো উইলসন সেন্টার ও স্টিমসন সেন্টারের এনার্জি, ওয়াটার অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো অস্টিন লর্ড এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, আমরা এখন প্রতি ৫ থেকে ১০ বছরের ব্যবধানে এমন সব বন্যার মুখোমুখি হচ্ছি যা আগে ১০০ বছরে একবার দেখা যেত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকিগুলো আমাদের নিরাপত্তার সীমানা নিয়ে ভাবার ক্ষমতার চেয়েও অনেক দ্রুত রূপ পরিবর্তন করছে। এতসব অজানা বিষয় সঙ্গে নিয়ে আমরা যদি একসাথে কাজ শুরু না করি, তবে কোনো অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে না এবং পরবর্তীতে আবারও আমাদের এমন বিপর্যয়ের মুখে অসহায়ভাবে তলিয়ে যেতে হবে।
হিমালয়ের ভূখণ্ড টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়া থেকে উদ্ভূত এবং এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো মূল হিমবাহ থেকে তাদের পানি সংগ্রহ করে। এই নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিম্নমুখী হয়ে প্রবাহিত হওয়া এই পানির ওপর নির্ভরশীল। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশগত ও ভূ-তাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি হলেও এর প্রবল নদীগুলোকে বশ করে মেগা-জলবিদ্যুৎ তৈরি করার চিন্তা প্রকৌশলীদের বহু দিন ধরেই প্রলুব্ধ করে আসছে। চীনের সাম্প্রতিক বাঁধ নির্মাণ প্রযুক্তির অগ্রগতি, কয়লা ছেড়ে পরিবেশবান্ধব শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার তাগিদ এবং ভারত-চীন সীমান্তে চলমান দীর্ঘদিনের উচ্চ-উচ্চতার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত পরিবর্তনকে তরান্বিত করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জলবায়ু ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল মনে করেন, পাহাড়গুলোকে আগে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে পশ্চাৎপদ এলাকা বা সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্র হিসেবে দেখত, এখন সেই দৃষ্টিকোণ বদলে গেছে এবং সেগুলোকে সম্পদ হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এটি কেবল জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিষয় নয় এর সাথে খনিজ সম্পদ ও পর্যটনের বিষয় জড়িয়ে আছে। সেখানে একটি সামরিক-শিল্প জটিলতা কাজ করছে এবং তার সাথে সম্পর্কিত প্রচুর অবকাঠামো সেখানে তৈরি হচ্ছে।
বেইজিং বিশাল আকৃতির আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন তৈরি করছে যাতে তিব্বতের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ছড়িয়ে থাকা সৌর ও উইন্ড ফার্ম থেকে তৈরি হওয়া পরিচ্ছন্ন শক্তি চীনের শিল্পভিত্তিক পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে নিয়ে যাওয়া যায়। এছাড়া ১৯৫৯ সালে চতুর্দশ দালাই লামার ভারতে নির্বাসনের পর থেকে তিব্বত অঞ্চলে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও তা ধরে রাখতে বেইজিং সবসময় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের নতুন মেগা-ড্যাম প্রকল্পটি গবেষকদের মতে তিব্বতে বাস্তবায়নাধীন ডজন ডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্যতম। পাহাড় কেটে টানেল বানিয়ে প্রায় ২ হাজার মিটারের একটি সুবিশাল উচ্চতার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বিশ্বের অন্য যেকোনো বাঁধের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সাথে চীন বিতর্কিত সীমান্ত এলাকা জুড়ে দ্রুত সামরিক যান চলাচলের সুবিধার্থে নতুন নতুন গ্রাম ও অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এর প্রেক্ষিতে ভারতও পিছিয়ে নেই। ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত জলবিদ্যুৎ কোম্পানি চীনের প্রকল্পের ভাটিতে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়া দিল্লি পর্বত অতিক্রমকারী বেশ কিছু জটিল টানেল ও রেলপথের উদ্বোধন করেছে, যা সীমান্তে দ্রুত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনে সাহায্য করবে। আর নেপালও তাদের দুই পরাশক্তি প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে তাদেরই অর্থায়নে হিমালয়ের নদীগুলোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বৃদ্ধি করেছে। উপরন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রসারের কারণে বিদ্যুতের বিশ্বব্যাপী যে তীব্র চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তা হিমালয়ের নদীগুলোকে ব্যবহারের প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
চৈনিক প্রকৌশলীরা বিশ্বমঞ্চে অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত এবং তারা দুর্যোগ মোকাবিলার নানা কৌশল ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা তাদের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড়ের পাথর চূর্ণ করা, প্রাকৃতিক কাঠামোতে কংক্রিট ঢালা এবং কৃত্রিম জলাধারে পানি জমিয়ে রাখার মতো চূড়ান্ত নির্মাণকাজগুলোর কিছু অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ এবং হিমবাহের হ্রদ ফাটা প্লাবন এই অঞ্চলের সাধারণ বৈশিষ্ট হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এগুলো এখন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে কোনো দুর্যোগ তৈরি হলে তা স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে।
যেমনটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে দেখা গেছে। সেখানে নিখোঁজ শত শত শ্রমিকের পাশাপাশি ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৪৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে, যা হাজার হাজার পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। দেশটির জ্বালানি, পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর আরও ৪৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সীমান্তবর্তী দুর্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে কিছু গুঞ্জনও ডালপালা মেলেছিল যে এই বিপর্যয়টি নাকি চীনের সীমান্তের ভেতরের কোনো বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে ঘটেছে। এই গুঞ্জনের পেছনে কোনো বস্তুগত ভিত্তি না থাকলেও, তা দেখিয়ে দেয় কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সীমান্ত অঞ্চলে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। নেপালে নিযুক্ত চীনা দূতাবাস এক্স (টুইটার)-এ দেওয়া এক বার্তায় এই ধরণের অভিযোগ ও চীনা সতর্কবার্তা দিতে দেরি হওয়ার খবরকে পুরোপুরি ভুয়া খবর বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো সমাধান হবে না বরং পারস্পরিক সহযোগিতাই জীবন বাঁচাতে পারে। পরবর্তীতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের কাছে পাঠানো এক বার্তায় উদ্ধার অভিযানে সব ধরনের সক্রিয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। উভয় পক্ষই একটি তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদ বা ব্যারিয়ার লেক নজরদারিতে রাখতে যোগাযোগ বজায় রাখছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে বড় বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। যদিও সরাসরি ওই এলাকায় নেপালের নজরদারির ব্যবস্থা নেই, তবে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ এবং গবেষকদের মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা আদান-প্রদান চলছে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইয়ারলুং সাংপো মেগা-ড্যাম প্রকল্পের নকশা বা তথ্য ভারতের সাথে শেয়ার না করার জন্য চীন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০১৭ সালের সীমান্ত সংকটের সময়ও চীন কিছু সময়ের জন্য আন্তঃসীমান্ত নদীর হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য দেওয়া বন্ধ রেখেছিল, যদিও বেইজিং সবসময় নিজেদের তথ্য স্বচ্ছতার দাবি করে এসেছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্ত আলোচনায় চীন ও ভারত নিজেদের মধ্যে নদীর তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে এবং তাদের আসন্ন দ্বি-বার্ষিক বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, যদি এই অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের গতি বজায় রাখতেই হয়, তবে দেশগুলোকে কেবল বিশাল মেগা-প্রকল্প তৈরির মানসিকতা থেকে বের হয়ে দুর্যোগ সহনশীল প্রকল্প তৈরি করতে হবে। একই সাথে একটি সমন্বিত আগাম সতর্কতা ও তথ্য আদান-প্রদানের আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির রূপ ক্রমেই বদলাচ্ছে। রুথ গ্যাম্বলের ভাষায়, আমরা ধরে নিচ্ছি যে ভবিষ্যৎ ঠিক বর্তমানের মতোই থাকবে এবং এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় অহংকার বা ভুল ধারণা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তা আমাদের সম্পূর্ণ অজানা।
সূত্র: সিএনএন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
তিব্বত ও নেপাল সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী বন্যা এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে আবারও কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই বিপর্যয়টি ঠিক এমন একটি সময়ে ঘটেছে, যখন এ অঞ্চলের দেশগুলো তীব্র গতিতে এই অতি-উচ্চতাকোলের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নিজেদের অবকাঠামোগত বিস্তার বাড়িয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে উভয় সীমান্তে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। যদিও এই নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সরাসরি মানবসৃষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কোনো সংযোগের প্রমাণ মেলেনি, তবে উদ্ভূত এই বিধ্বংসী পরিস্থিতি সেইসব দেশের সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের বাস্তবতার ধাক্কা হতে পারে, যারা হিমালয় জুড়ে জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে বাঁধ, টানেল, মহাসড়ক, রেলপথ ও সেতু নির্মাণের এক বিশাল প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এই অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রযাত্রায় কোনো দেশই চীনের মতো বিশাল পরিসরে উদ্যোগ নেয়নি। বেইজিংয়ের কাছে তিব্বত এবং এর হিমালয় সীমান্ত এলাকা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয় বরং জাতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। চীন সরকার এই অঞ্চলটিকে সবুজ শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা ১৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল মেগা-বাঁধ নির্মাণ করছে, যা মানব প্রকৌশলবিদ্যার পূর্ববর্তী সমস্ত সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে এই দৌড়ে চীন একা নয়। ভারত এবং কিছুটা কম পরিসরে হলেও নেপালও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবকাঠামো তৈরির খেলায় মেতে উঠেছে। পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, ভূমিকম্পপ্রবণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা এই অঞ্চলে দেশগুলো কোটি কোটি ডলার ঢালছে। কিন্তু গত বুধবার সকালে প্রকৃতির সেই ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা আরও একবার নিষ্ঠুরভাবে দৃশ্যমান হয়, যখন পাহাড়ের একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ে শক্তিশালী ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এর ফলে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত বিশাল এলাকা জুড়ে ভবন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং গ্রাম, রাস্তাঘাট, সেতু ও একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়, যার চূড়ান্ত মানসিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হিসাব করা সম্ভব হয়নি।
দুর্যোগের পর থেকে উভয় সীমান্তেই উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদ ভেঙে পুনরায় বন্যা ও ভূমিধসের মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্যোগের তীব্র হুমকি তৈরি হয়েছে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্ধার ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একাধিক হিমবাহ, হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ, সম্ভাব্য ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি এবং পরিবর্তনশীল আবহাওয়াকে চরম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, নেপালে রবিবারও উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ থাকা ৯০০ জনেরও বেশি শ্রমিকের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন এবং প্রকল্পগুলোর টানেলে আটকে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন।
হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর এই বিশাল অবকাঠামোগত স্বপ্ন পূরণের পথে এই মহাপরিপর্যয় কোনো সতর্কবার্তা বা ঘুম ভাঙার মতো ঘটনা হিসেবে কাজ করবে কি না, তা নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার ভয়াবহতা এবং এটি একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তে ঘটে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাকারীদের এখন আরও গভীর সতর্কতার সাথে ভাবা উচিত যে তারা কীভাবে এই অঞ্চলে প্রকল্পগুলোর নকশা, অবস্থান ও আকার নির্ধারণ করবেন। পাশাপাশি এটি যৌথ ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার জন্য একটি আঞ্চলিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিন দিন আরও চরম এবং অননুমেয় রূপ নিচ্ছে।
উড্রো উইলসন সেন্টার ও স্টিমসন সেন্টারের এনার্জি, ওয়াটার অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো অস্টিন লর্ড এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, "আমরা এখন প্রতি ৫ থেকে ১০ বছরের ব্যবধানে এমন সব বন্যার মুখোমুখি হচ্ছি যা আগে ১০০ বছরে একবার দেখা যেত।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকিগুলো আমাদের নিরাপত্তার সীমানা নিয়ে ভাবার ক্ষমতার চেয়েও অনেক দ্রুত রূপ পরিবর্তন করছে। এতসব অজানা বিষয় সঙ্গে নিয়ে আমরা যদি একসাথে কাজ শুরু না করি, তবে কোনো অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে না এবং পরবর্তীতে আবারও আমাদের এমন বিপর্যয়ের মুখে অসহায়ভাবে তলিয়ে যেতে হবে।
হিমালয়ের ভূখণ্ড টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়া থেকে উদ্ভূত এবং এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো মূল হিমবাহ থেকে তাদের পানি সংগ্রহ করে। এই নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিম্নমুখী হয়ে প্রবাহিত হওয়া এই পানির ওপর নির্ভরশীল। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশগত ও ভূ-তাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি হলেও এর প্রবল নদীগুলোকে বশ করে মেগা-জলবিদ্যুৎ তৈরি করার চিন্তা প্রকৌশলীদের বহু দিন ধরেই প্রলুব্ধ করে আসছে। চীনের সাম্প্রতিক বাঁধ নির্মাণ প্রযুক্তির অগ্রগতি, কয়লা ছেড়ে পরিবেশবান্ধব শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার তাগিদ এবং ভারত-চীন সীমান্তে চলমান দীর্ঘদিনের উচ্চ-উচ্চতার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত পরিবর্তনকে তরান্বিত করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জলবায়ু ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল মনে করেন, পাহাড়গুলোকে আগে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে পশ্চাৎপদ এলাকা বা সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্র হিসেবে দেখত, এখন সেই দৃষ্টিকোণ বদলে গেছে এবং সেগুলোকে সম্পদ হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "এটি কেবল জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিষয় নয় এর সাথে খনিজ সম্পদ ও পর্যটনের বিষয় জড়িয়ে আছে। সেখানে একটি সামরিক-শিল্প জটিলতা কাজ করছে এবং তার সাথে সম্পর্কিত প্রচুর অবকাঠামো সেখানে তৈরি হচ্ছে।"
বেইজিং বিশাল আকৃতির আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন তৈরি করছে যাতে তিব্বতের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ছড়িয়ে থাকা সৌর ও উইন্ড ফার্ম থেকে তৈরি হওয়া পরিচ্ছন্ন শক্তি চীনের শিল্পভিত্তিক পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে নিয়ে যাওয়া যায়। এছাড়া ১৯৫৯ সালে চতুর্দশ দালাই লামার ভারতে নির্বাসনের পর থেকে তিব্বত অঞ্চলে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও তা ধরে রাখতে বেইজিং সবসময় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের নতুন মেগা-ড্যাম প্রকল্পটি গবেষকদের মতে তিব্বতে বাস্তবায়নাধীন ডজন ডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্যতম। পাহাড় কেটে টানেল বানিয়ে প্রায় ২ হাজার মিটারের একটি সুবিশাল উচ্চতার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি বিশ্বের অন্য যেকোনো বাঁধের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সাথে চীন বিতর্কিত সীমান্ত এলাকা জুড়ে দ্রুত সামরিক যান চলাচলের সুবিধার্থে নতুন নতুন গ্রাম ও অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এর প্রেক্ষিতে ভারতও পিছিয়ে নেই। ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত জলবিদ্যুৎ কোম্পানি চীনের প্রকল্পের ভাটিতে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়া দিল্লি পর্বত অতিক্রমকারী বেশ কিছু জটিল টানেল ও রেলপথের উদ্বোধন করেছে, যা সীমান্তে দ্রুত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনে সাহায্য করবে। আর নেপালও তাদের দুই পরাশক্তি প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে তাদেরই অর্থায়নে হিমালয়ের নদীগুলোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বৃদ্ধি করেছে। উপরন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রসারের কারণে বিদ্যুতের বিশ্বব্যাপী যে তীব্র চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তা হিমালয়ের নদীগুলোকে ব্যবহারের প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
চৈনিক প্রকৌশলীরা বিশ্বমঞ্চে অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত এবং তারা দুর্যোগ মোকাবিলার নানা কৌশল ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা তাদের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করছেন। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড়ের পাথর চূর্ণ করা, প্রাকৃতিক কাঠামোতে কংক্রিট ঢালা এবং কৃত্রিম জলাধারে পানি জমিয়ে রাখার মতো চূড়ান্ত নির্মাণকাজগুলোর কিছু অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ এবং হিমবাহের হ্রদ ফাটা প্লাবন এই অঞ্চলের সাধারণ বৈশিষ্ট হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এগুলো এখন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে কোনো দুর্যোগ তৈরি হলে তা স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে।
যেমনটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে দেখা গেছে। সেখানে নিখোঁজ শত শত শ্রমিকের পাশাপাশি ১২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৪৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে, যা হাজার হাজার পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। দেশটির জ্বালানি, পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর আরও ৪৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সীমান্তবর্তী দুর্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে কিছু গুঞ্জনও ডালপালা মেলেছিল যে এই বিপর্যয়টি নাকি চীনের সীমান্তের ভেতরের কোনো বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে ঘটেছে। এই গুঞ্জনের পেছনে কোনো বস্তুগত ভিত্তি না থাকলেও, তা দেখিয়ে দেয় কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সীমান্ত অঞ্চলে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। নেপালে নিযুক্ত চীনা দূতাবাস এক্স (টুইটার)-এ দেওয়া এক বার্তায় এই ধরণের অভিযোগ ও চীনা সতর্কবার্তা দিতে দেরি হওয়ার খবরকে পুরোপুরি ভুয়া খবর বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো সমাধান হবে না বরং পারস্পরিক সহযোগিতাই জীবন বাঁচাতে পারে। পরবর্তীতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের কাছে পাঠানো এক বার্তায় উদ্ধার অভিযানে সব ধরনের সক্রিয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। উভয় পক্ষই একটি তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদ বা ব্যারিয়ার লেক নজরদারিতে রাখতে যোগাযোগ বজায় রাখছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে বড় বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। যদিও সরাসরি ওই এলাকায় নেপালের নজরদারির ব্যবস্থা নেই, তবে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ এবং গবেষকদের মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা আদান-প্রদান চলছে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইয়ারলুং সাংপো মেগা-ড্যাম প্রকল্পের নকশা বা তথ্য ভারতের সাথে শেয়ার না করার জন্য চীন আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০১৭ সালের সীমান্ত সংকটের সময়ও চীন কিছু সময়ের জন্য আন্তঃসীমান্ত নদীর হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য দেওয়া বন্ধ রেখেছিল, যদিও বেইজিং সবসময় নিজেদের তথ্য স্বচ্ছতার দাবি করে এসেছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্ত আলোচনায় চীন ও ভারত নিজেদের মধ্যে নদীর তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে এবং তাদের আসন্ন দ্বি-বার্ষিক বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, যদি এই অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের গতি বজায় রাখতেই হয়, তবে দেশগুলোকে কেবল বিশাল মেগা-প্রকল্প তৈরির মানসিকতা থেকে বের হয়ে দুর্যোগ সহনশীল প্রকল্প তৈরি করতে হবে। একই সাথে একটি সমন্বিত আগাম সতর্কতা ও তথ্য আদান-প্রদানের আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির রূপ ক্রমেই বদলাচ্ছে। রুথ গ্যাম্বলের ভাষায়, "আমরা ধরে নিচ্ছি যে ভবিষ্যৎ ঠিক বর্তমানের মতোই থাকবে এবং এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় অহংকার বা ভুল ধারণা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তা আমাদের সম্পূর্ণ অজানা।"
সূত্র: সিএনএন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চলতি মৌসুমে সারা দেশে আমন ধানের চাষাবাদ শুরু হয়েছে। তবে বৃষ্টির অভাবের কারণে
সংকটে কৃষকরা শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে ধানের চারা রোপণ করছেন। বিভিন্ন অঞ্চলে পানি সংকটের কারণে আবাদি আমন ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমন চাষ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় আমনক্ষেত শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এর ফলে কৃষকরা আমন ধানের বৃদ্ধি ও ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আষাঢ় শ্রাবণ মাস বর্ষাকাল হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বৃষ্টি না হওয়ায়, কৃষকরা বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প ব্যবহার করে জমিতে পানি নিয়ে আমন চারা রোপণ করছেন। বৃষ্টির অভাবে ফসলের জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে চিলমারী উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির পানি শুকিয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, কৃষকরা চারাগাছগুলোকে রক্ষা করার জন্য আবার শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছেন। এতে ফসল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে এবং খরা দীর্ঘ হলে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা জানান, এই অঞ্চলে আমন চারা রোপণের উপযুক্ত সময় আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে এবারে বৃষ্টি না হওয়ায়, জমিতে পানি না থাকার কারণে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প দিয়ে জমি তৈরি করে আমন রোপণ করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে, জমিতে আগাছা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়তে পারে। থানাহাট ইউনিয়নের গাবেরতল এলাকার আমন চাষি সোহেল রানা বলেন, "বৃষ্টির অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চার বিঘা জমিতে আমন চারা রোপণ করি। ফসলের ক্ষেতে পানি না থাকায়, বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিচ্ছি।" রাজারভিটা এলাকার কৃষক আবুল হোসেন বলেন, "সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায়, আমন চাষে খরচ বেড়েছে। বৃষ্টি না হলে সেচের খরচও বাড়বে।" চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, "ধানের বৃদ্ধি পর্যায়ে
ঘাটতি হলে গাছের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে।" একই সঙ্গে কুশির সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং আগাছার পরিমাণ বাড়তে পারে। থোড় পর্যায়ে পানির ঘাটতি হলে শীষের দৈর্ঘ্য কমে যেতে পারে এবং চিটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ফলন কমার ঝুঁকি রয়েছে।
আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ, শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র। তবু কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। বৃষ্টির অভাবে শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে ফসলের মাঠ। মাঝে-মধ্যে সামান্য বৃষ্টি হলেও শুকনো মাটি তা শুষে নিচ্ছে মুহূর্তেই। তীব্র খরায় চলতি মৌসুমে আমন চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চাষিরা। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন ও বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে জমিতে পানি দিতে হচ্ছে। ফলে বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানও এখন সেচনির্ভর হয়ে উঠছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং খরা দীর্ঘ হলে আমনের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমন ধানের চারা রোপণ শেষের দিকে। পানির অভাবে অনেক জমি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কোথাও শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে ধানের চারা রোপণ করছেন। প্রচণ্ড খরায় রোপণ করা জমিও শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও শুকিয়ে মারা যাচ্ছে ধানের চারা। এতে আমন চাষিদের চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাদারগঞ্জে ১৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। বাকি জমিতে চলতি সপ্তাহের মধ্যে চারা রোপণ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাষিরা জানান, আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় আষাঢ় থেকে ভাদ্রের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায়, অনেকে সময়মতো চারা রোপণ করতে পারেননি। ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়েও অনেক কৃষক সেচ দিয়ে চারা রোপণ করছেন। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে জমিতে আগাছা, রোগ ও পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে।
জোড়খালী ইউনিয়নের ফুলজোড় এলাকার কৃষক আহমেদ আলী বলেন, "বৃষ্টির অভাবে মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। জমিতে হাল দেওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো ধানের চারা রোপণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন গভীর নলকূপের পানি দিয়ে জমি তৈরি করে আমন রোপণ করা ছাড়া উপায় নেই।"
কৃষক সুজন আহমেদ বলেন, "সার-বিষ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এমনিতেই আমন চাষে খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে সেচ খরচও বাড়ছে। ফলে এবার আমন চাষে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি খরচ হতে পারে।"
চাষিরা আরো জানান, প্রতি বিঘা জমিতে হালচাষ, চারা রোপণ, সার-কীটনাশক, সেচ ও ধান কাটাসহ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বৃষ্টির ঘাটতি দীর্ঘ হলে সেচের খরচ আরো বাড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টিপাত কম হলেও চলতি মৌসুমে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমেও প্রচণ্ড রোদ ও খরা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে দ্রুতই আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ