০১:৫২ পি.এম
আগামী ৭ নভেম্বর নিউজিল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনমত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশিত। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল হলো মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৩ সালের নির্বাচনের মতো এবারও সরকার গঠনে ছোট দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাদের সমর্থন নির্ধারণ করে দিতে পারে, শেষ পর্যন্ত কারা সরকার গঠন করবে। নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এমন দল ও তাদের নেতাদের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
ন্যাশনাল পার্টি
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শেষ হলেও জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকবে: আইইএ প্রধান
নিউজিল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৫৬ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার লুক্সন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছেন। ২০২০ সালে অকল্যান্ডের বোটানি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তী বছর ন্যাশনাল পার্টির নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন লুক্সন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি এয়ার নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে অর্থনীতি ভালোভাবে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার নেতৃত্বে জয় পায় ন্যাশনাল পার্টি। তবে গত এক বছরে তার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও আগস্টে দলের সংসদ সদস্যদের আনা আস্থা ভোটে টিকে যান লুক্সন। আগস্টে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জনমত জরিপে দলের সমর্থন কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক চাপ এবং জোটের শরিকদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ন্যাশনাল পার্টি। বাজেটে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এনে উদ্বৃত্ত অর্জন এবং কিউইসেভার নামের পেনশন সঞ্চয় কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
লেবার পার্টি
৪৮ বছর বয়সী ক্রিস হিপকিন্সের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে লেবার পার্টি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। ২০০৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হিপকিন্স। জেসিন্ডা আরডার্নের পদত্যাগের পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তবে ওই বছরের অক্টোবরে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা হারান। এরপর থেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হিপকিন্স। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তার দল। লেবার পার্টির পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন খরচ কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ এবং সরকারি সেবা উন্নত করা।
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে লাশ দাফনে বাধা, নাহিদ ইসলামের নিন্দা ও ইনসাফের আহ্বান
নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট
উইনস্টন পিটার্সের নেতৃত্বে নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর দল কখনো লেবার, আবার কখনো ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে জোট গঠন করেছে।
এবারের নির্বাচনে দলটি প্রস্তাব দিয়েছে, নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে শুধুমাত্র দেশটির নাগরিকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রি—দুই কাজই করে এমন বড় কোম্পানিগুলোকে আলাদা করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া দেশটির বড় সুপারমার্কেট ব্যবসার একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাগ করে দুটি আলাদা সুপারমার্কেট কোম্পানি গড়ার প্রস্তাবও রয়েছে। পিটার্স চান, নিউজিল্যান্ড প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসুক। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে দুটি লক্ষ্য রাখার পক্ষে তিনি। লক্ষ্য দুটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
অ্যাক্ট নিউজিল্যান্ড
আরও পড়ুন: মিসরের পার্লামেন্ট সৌদিকে সামরিক সহায়তা দিতে অনুমোদন করেছে
অ্যাক্ট নিউজিল্যান্ড একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল, যা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। দেশটির সংসদের ১২৩টি আসনের মধ্যে বর্তমানে দলটির আসন ১১টি। ন্যাশনাল পার্টি ও নিউ জিল্যান্ড ফার্স্টের সঙ্গে জোটে রয়েছে দলটি। ডেভিড সেমুর দলটির নেতা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের নির্বাচনের আগে অভিবাসন নিয়ে ছয় দফার পরিকল্পনা দিয়েছে অ্যাক্ট। এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিউজিল্যান্ড থেকে বহিষ্কার করা। তারা যত দিন ধরেই দেশটিতে বসবাস করুন না কেন, এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছে দলটি। অস্থায়ী কাজের ভিসার ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ এবং নতুন করে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে তাদের পরিকল্পনায়।
গ্রিন পার্টি
গ্রিন পার্টি, যা ক্লোয়ি সোয়ারব্রিক ও মারামা ডেভিডসনের যৌথ নেতৃত্বে রয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দেয়। অতীতে এই বামপন্থী দলটি লেবার পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, প্রকৃতি রক্ষা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিচ্ছে দলটি। গ্রিন পার্টি সম্পদের ওপর কর এবং বড় কোম্পানি, ব্যাংক ও বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর বেশি কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে আয়ের প্রথম ১০ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলারের ওপর কর না নেওয়া এবং অধিকাংশ করদাতার আয়কর কমানোর পরিকল্পনা করেছে তারা। ১০ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার প্রায় ৫ হাজার ৬১৪ মার্কিন ডলারের সমান। দলটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কিউইপাওয়ার নামে একটি বিদ্যুৎ কোম্পানি গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি বাড়িতে তাপ ধরে রাখার ব্যবস্থা উন্নত করা, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ব্যাটারি কেনার জন্য সুদবিহীন ঋণ দেওয়ার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া কিউইমার্ট নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সুপারমার্কেটের একটি চেইন গড়ে তুলতে চায় দলটি। মুদি পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো ঠেকাতে আরো কঠোর নিয়ম চালুর প্রস্তাবও রয়েছে তাদের।
তে পাতি মাওরি
আরও পড়ুন: বিদেশি ঋণ শোধে চাপ বাড়ছে, সহায়তার অর্থছাড় কমেছে
জনমত জরিপে পাতি মাওরি পার্টির সমর্থন ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। সাধারণভাবে সংসদে আসন পেতে দলগুলোর এই পরিমাণ ভোট প্রয়োজন হয়। তবে নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনী ব্যবস্থায় মাওরি জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত সাতটি বিশেষ আসনের কয়েকটিতে দলটি জিততে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মাওরি ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। মাওরি ভোটারদের জন্য নির্ধারিত সাতটি আসনের মধ্যে বর্তমানে ছয়টি তাদের দখলে রয়েছে। রাওইরি ওয়াইতিতি ও ডেবি গারেওয়া-প্যাকার যৌথভাবে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে তারা একসঙ্গে দলের দায়িত্ব পালন করছেন। গারেওয়া-প্যাকার জানিয়েছেন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা এবং সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা তাদের নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অপরচুনিটি
অর্থনীতিবিদ গ্যারেথ মরগান ২০১৬ সালে ‘দ্য অপরচুনিটিজ পার্টি’ নামে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে দলটি অপরচুনিটি নামে পরিচিত। আগের তিনটি নির্বাচনে অংশ নিয়েও দলটি সংসদে আসন পায়নি। ২০১৭ সালের নির্বাচনে দলটি সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। বর্তমানে অকল্যান্ডের ব্যবসায়ী কিউলে ওং দলটির নেতা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দলটির পঞ্চম নেতা। ওং বলেছেন, তার দল বাস্তবায়নযোগ্য এবং ব্যয়ের হিসাব করা সংস্কারের পক্ষে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চান তারা। তার দাবি, দলটি বামপন্থী বা ডানপন্থী—কোনো শিবিরেরই নয়। এবারের নির্বাচনে অপরচুনিটির প্রধান প্রতিশ্রুতি জমির মূল্যের ওপর কর আরোপ। আবাসিক জমির মূল্যের ওপর বছরে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ জমির মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। অপরচুনিটির দাবি, এ কর থেকে বছরে ২৪ বিলিয়ন নিউজিল্যান্ড ডলার আয় হবে। এই অর্থ দিয়ে করব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
আরও পড়ুন: চকরিয়ায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা আকিত হোসেন সজিব গ্রেফতার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন