প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। গাজা ও সিরিয়ার পর, এবার তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার তীব্র উত্তেজনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে লেবানন উত্থিত হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান সম্প্রতি এক হুঁশিয়ারিতে উল্লেখ করেছেন, তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা আর কেবল নিজস্ব সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দামেস্ক ও বৈরুত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। এরদোগানের এই মন্তব্যের পর, আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে কূটনৈতিক যুদ্ধ একটি নতুন মোড় নিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে, নিজস্ব সংসদীয় কমিটির বৈঠকে লেবানন ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং তুরস্কের নিরাপত্তারযে স্বার্থ রয়েছে, তার জন্য আঙ্কারা লেবাননের পরিস্থিতি মনিটর করছে।
ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (আইএনএসএস)-এর গবেষক গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস বলেন: "লেবানন এখন ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র। এরদোগান যেভাবে সিরিয়া ও লেবাননকে তুরস্কের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তা ইসরায়েলের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দুই দেশের ইতিমধ্যে বিগড়ে থাকা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ক্রমাগত চাপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য, তুরস্ক নীরবে এগিয়ে আসছে। গত কয়েক বছরে লেবাননে মানবিক সাহায্য এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিজেদের ‘সফট পাওয়ার’ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে আঙ্কারা।
তুরস্কের মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ওজলেম তুর বলেন, "ইরানের ক্ষমতা হ্রাসের পর লেবাননে যেন ইসরায়েলের একক আধিপত্য সৃষ্টি না হয়, তা নিয়ে আঙ্কারা উদ্বিগ্ন। এই ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার শূন্যতা কে পূরণ করবে, সেই প্রতিযোগিতায় তুরস্ক নিজেকে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।"
এই বিরোধের পেছনে কেবল সামরিক আধিপত্য নয়, বরং রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থও। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিশাল জ্বালানি ও গ্যাস সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব বহুদিনের।
২০২৫ সালের নভেম্বরে সাইপ্রাসের সঙ্গে লেবাননের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখছে আঙ্কারা। তুরস্কের দাবি, এই চুক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং তুর্কি সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এদিকে, ইসরায়েলের ইন্ধনে লেবানন এই চুক্তি করেছে বলেও ভাবে আঙ্কারা, যা এই বিরোধে নতুন অর্থনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছে ওয়াশিংটনকে বোঝানোর জন্য যেন তারা তুরস্ককে পরবর্তী 'টার্গেট' হিসেবে বিবেচনা করে। তবে তুরস্কের ইস্তাম্বুল কাদির হাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেরহাত গুভেঞ্চের মতে, এরদোগানের হাতে রয়েছে একটি বড় 'ট্রাম্প কার্ড'। তা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোগানের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক।
সম্প্রতি বৈরুতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের তীব্র সমালোচনা করেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং মধ্যস্থতার জন্য আঙ্কারাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করছে।
আগামী মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক সফরে আসছেন ট্রাম্প। সেখানে মার্কিন ও তুর্কি শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে লেবাননসহ সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুটি প্রধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, মার্কিন-তুর্কি এই ঘনিষ্ঠতা তেল আবিবের কূটনৈতিক অস্বস্তি ও একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন