প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান যৌথভাবে একটি বিশাল সামরিক জোট গঠন করছে। গত শুক্রবার, তিন দেশের নেতারা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছেন।
এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর যদি সশস্ত্র হামলা হয়, তাহলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে ধরা হবে। পাশাপাশি, তিন দেশ সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও এর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার বিস্তার ও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়তে থাকায়, এই চুক্তিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সামরিক শক্তির দিক থেকে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান একত্রিত হলে এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট। সৌদি আরব পৃথিবীর অন্যতম প্রধান তেল রফতানিকারক, তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী এবং পাকিস্তান হলো একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচকের অনুযায়ী, তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা স্থল, আকাশ এবং নৌ—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য।
তিন দেশের সক্রিয় সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে পাকিস্তানের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার, তুর্কির রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার।
সক্রিয় সেনাবাহিনীর সাথে সাথে, তিন দেশের রিজার্ভ ও আধাসামরিক বাহিনীও রয়েছে। ফলে প্রয়োজনের সময়ে সম্মিলিত জনবল বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই জনশক্তি তিন দেশের সামরিক জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। পাকিস্তান বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতা ও বড় পেশাদার সেনাবাহিনীর কারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আকাশপথে তিন দেশ মিলে একটি বড় শক্তি তৈরি করছে। তাদের সম্মিলিত সামরিক উড়োজাহাজের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৪১৫টি। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছে।
পাকিস্তানের হাতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৯৭টি সামরিক বিমান, তুরস্কের রয়েছে ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদি আরবের প্রায় ৯১৭টি। তুরস্কের সামরিক বিমানশক্তির সাথে যুক্ত হয়েছে দ্রুত বিকাশমান ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধবিমান পরিচালনা ও আকাশ প্রতিরক্ষায় দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। সৌদি আরবের বিমানবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উন্নত যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
ফলস্বরূপ, তিন দেশের বিমান সক্ষমতা শুধুমাত্র সংখ্যার দিক থেকেই বৃহৎ নয়; প্রযুক্তিগত এবং যুদ্ধে সক্ষমতার দিক থেকেও বৈচিত্র্য রয়েছে।
স্থলবাহিনীর ক্ষেত্রেও তিন দেশের সম্মিলিত শক্তি উল্লেখযোগ্য। তাদের হাতে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৪৬টি ট্যাংক এবং ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। এর সাথে রয়েছে হাজার হাজার আর্টিলারি ব্যবস্থা এবং একাধিক রকেট লঞ্চার ব্যবস্থা।
ট্যাংকের সংখ্যায় পাকিস্তান এগিয়ে। দেশটির হাতে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৭৭টি ট্যাংক, তুরস্কের রয়েছে ২ হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের ১ হাজার ৮৫টি। স্থলযুদ্ধে পাকিস্তানের বিশাল সেনাবাহিনী ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা, তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও সৌদি আরবের বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
নৌসক্ষমতার দিক থেকেও তিন দেশের সম্মিলিত শক্তি উল্লেখযোগ্য। তাদের কাছে রয়েছে প্রায় ৩৪৪টি নৌযান, এর মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি করভেট এবং ২২টি সাবমেরিন রয়েছে।
তুরস্কের নৌবাহিনী তিন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ায়, সমুদ্রভিত্তিক সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের নৌবাহিনী আরব সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌদি আরবের অবস্থান পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকেও তিন দেশ শক্তি প্রকাশ করছে। ২০২৬ সালে, তাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১২৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে সৌদি আরব, প্রায় ৬৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
এই চুক্তি বিষয়টি এমন যে, এটি শুধু সামরিক সহযোগিতা নয়, বরং তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও বড় অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ডেভিড দেস রোশেসের মতে, সৌদি আরবের জন্য অস্ত্র সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা খুব জরুরি।
এই চুক্তি শুধু সামরিক নয়, বরং প্রতিরক্ষা শিল্প এবং অস্ত্রবাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই জোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পায় এবং সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের বৃহত্তম ক্রেতাদের মধ্যে একটি।
চুক্তির ভাষা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তিটি অন্তত মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর জন্ম দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন