প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কাতারের রাজধানী দোহায় রবিবার ইরানের প্রতিনিধিদল এবং কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনা টানা তৃতীয় দিনের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করা হয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে তেহরান কিছু শর্ত আরোপ করেছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং ইরান ও ওমানের দ্বারা নির্ধারিত নতুন নৌপথের স্বীকৃতি।
কয়েক মাস ধরে চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রেক্ষিতে এসব শর্ত প্রদান করেছে তেহরান। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু না হলে ওয়াশিংটন বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
তবে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার উদ্যোগের মধ্যেও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। এর মাত্র দুই দিন আগে চলাচলের অনুমতি পাওয়া একটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে ইরানের অনুমতি মিললেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল এখনো নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, জাহাজটি পাকিস্তানের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহন করছিল এবং এর নিরাপদ চলাচলের অনুমতি পাকিস্তানও আদায় করেছিল।
ব্লুমবার্গকে এ চালান সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ৩০ অক্টোবর হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজটিতে হামলার আগে কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’র নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছিল।
এর আগে পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল মনে হচ্ছিল। কারণ, একই প্রক্রিয়ায় ইরানের কাছ থেকে চলাচলের অনুমতি পাওয়া বেশ কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছিল।
তবে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তেহরানও কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাহাজটিতে হামলার ঘটনা পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, পাকিস্তান জাহাজ চলাচলের অনুমতি আদায়ে মধ্যস্থতা করতে পারলেও সেই অনুমতির পরও কোনো জাহাজ আক্রান্ত হলে তা ঠেকানোর ক্ষমতা দেশটির সীমিত।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক সইয়ের লক্ষ্যে আলোচনা আয়োজন করেছিল ইসলামাবাদ। এরপর অক্টোবরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দুইবার তেহরান সফর করেন।
এসব উদ্যোগের পর পাকিস্তানের এক সামরিক মুখপাত্র দেশটির মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা নিয়ে ‘সতর্কভাবে আশাবাদী’ মন্তব্য করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এ প্রচেষ্টার পথে বড় বাধা ও বিরোধীদের নিয়েও সতর্ক করেন। চলমান আলোচনার আয়োজক দেশ কাতারও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কাউকে হুমকি না দেওয়ার কারণে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। তবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকট এখন শুধু মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমন একজন পক্ষের প্রয়োজন, যে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে।
কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’তে হামলার ঘটনা বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও পরে সেটিতে হামলা হয়। এ ঘটনায় ইরানের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি এবং পাকিস্তানও তা ঠেকাতে পারেনি।
জাহাজটিতে হামলার জন্য এখনো কাউকে দায়ী করা হয়নি। কোনো পক্ষও হামলার দায় স্বীকার করেনি। কাতার কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে। এদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। গত অক্টোবরে সেখানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক হামলার ঘটনা ঘটেছে। তেহরানও তাদের বন্দর ও জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কথিত হামলার প্রমাণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার কাছে জমা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলাচলের অনুমতি পাওয়া জাহাজটিতে হামলার ঘটনা দুই দেশের আলোচনা ব্যাহত করতে চাওয়া পক্ষগুলোর কাজ হতে পারে। তবে হামলার দায় যারই হোক, এতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন, কারণ দেশটির গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পূরণ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে। কিন্তু গত অক্টোবরে কাতার থেকে মাত্র দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ পেয়েছে পাকিস্তান। গত বছরের একই সময়ে পেয়েছিল আটটি।
কাতারএনার্জি আগামী ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, তাৎক্ষণিকভাবে কেনা এলএনজির দাম চুক্তিমূল্যের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ থাকলে পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানির খরচ আরো বাড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে।
বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে পাকিস্তানের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও ভাগ করে নিতে হবে। সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও মিশরকে নিয়ে যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে অনুমতি পাওয়া কোনো জাহাজে হামলা হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে।
পাশাপাশি পাকিস্তানকে জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়াতে হবে। দেশটি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ে ১০টি এলএনজি কার্গো কেনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও আজারবাইজান থেকে জ্বালানি আমদানির কথা ভাবছে। এতে খরচ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা, দুইয়ের জন্যই জরুরি।
পাকিস্তানের উচিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সব পক্ষকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনা চলছে, তবে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁর কোনো তাড়া নেই।
ইসলামাবাদ দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ, আলোচনা আয়োজন ও প্রস্তাব বিনিময়ে সহায়তা করতে পারে। তবে সমুদ্রে কোনো পক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা যাচাই করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই নিজেদের ভূমিকা নিয়ে অতিরিক্ত দাবি করলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার দায় পাকিস্তানের ওপর পড়তে পারে।
চলতি বছর কাতার, তুরস্ক, ওমান ও পাকিস্তানের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলো আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব দেশের ভূমিকার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। তারা আলোচনা এগিয়ে নিতে পারলেও চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
দোহায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চললেও কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল মায়েদা’তে হামলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমুদ্রে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন