০৬:১৫ পি.এম
বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এছাড়া, মালয়েশিয়া আরসিইপিতে (রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) যোগদান এবং আসিয়ানের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা জোরদারের জন্য বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর একটি যৌথ বিবৃতিতে এই অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়।
আরও পড়ুন: ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে দ্রুত কয়লা উত্তোলনের দাবি জানাল ৫০০ জনের মানববন্ধন
গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটি প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার মাটিতে প্রধানমন্ত্রীর পদে এটিও তার প্রথম সফর হিসেবে চিহ্নিত হয়।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সফরকালে দুই নেতা ও তাদের প্রতিনিধিবর্গ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী অঙ্গীকার প্রদর্শন করেন। একই সময়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একাধিক দলিল বিনিময় সম্পর্কেও তারা প্রত্যক্ষ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রশংসার দাবিদার হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রত্যাশার একটি নতুন অধ্যায়।
আরও পড়ুন: পাঁচবিবির গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ, সরকারি সহযোগিতার দাবি
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন। দুই দেশের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে এ চুক্তিটি সম্পন্ন করা।
দ্বিমুখী বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি সম্পর্কে তারা গুরুত্ব আরোপ করেন।
উভয় নেতা এই সময় উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী হলো বাংলাদেশ। তারা দ্বিমুখী বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধির গুরুত্বের দিকে নজর দেন।
এছাড়া, উভয় দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের একটি কাঠামোবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি) গঠনের অগ্রগতি স্বাগত জানান।
আরও পড়ুন: ধুনটে পাঁচ কোটি টাকার সড়ক কাজ বন্ধ, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর ও লজিস্টিকস, হালাল শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং সহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই নেতা সম্মত হন।
বাংলাদেশের আরসিইপি আবেদনের প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থন প্রদানের বিষয়ক কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসাবে, তারা বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার সমর্থন জানান।
মালয়েশিয়া জানায়, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং এই অঞ্চলে তার কৌশলগত ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদান করে যে, ভবিষ্যতে আরসিইপিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ এ সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে আরসিইপি সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গাইবান্ধার স্মৃতি খাতুনের সাফল্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার মর্যাদা অর্জনের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার বাংলাদেশের এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আসিয়ানের কাঠামোর মধ্যে ঢাকার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার গঠনমূলক সমর্থনের আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিভিন্ন খাতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে জোরদারের ব্যাপারটি বোধগম্য হতে উঠে আসে।
দুই নেতার আলোচনায় শ্রমিক নিয়োগ অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আসে। তারা মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকেও স্বীকার করেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ওয়াকফের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বিদেশি কর্মী কোটার অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতি অনুসারে প্রতিটি আবেদনকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের বিষয়টিও উভয় দেশ আলোচনায় নেয়।
এটি বিদ্যমান শ্রমশক্তি অভিবাসন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করে চাহিদা অনুযায়ী একটি নতুন ও হালনাগাদ কাঠামো তৈরির জন্য।
নির্ভরযোগ্য অ্যাজেন্সির মাধ্যমে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।
আরও পড়ুন: সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে ৮৮ কারখানা কর্মমুখর হয়ে উঠছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মতো উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে তারা সম্মত হন।
সরকারী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর তারা জোর দেন। মালয়েশিয়ার বৃহত্তর বিনিয়োগ বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির হাইটেক পার্ক, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো 및 বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্বাগত জানানো হয়।
মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও পরীক্ষণ খাতের বৈশ্বিক সক্ষমতার বিষয়টিও তারা উল্লেখ পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচনা করে।
মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের প্রকৌশল স্নাতকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্ঞান-আদান-প্রদান কর্মসূচীর মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন কাঠামোর পক্ষেও আলোচনা করা হয়।
দুই নেতা বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ থাকার কথা স্বীকার করেন এবং বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নকে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে একমত হন।
তারা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট বিভাগ (জাকিম) এর চলমান সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে হালাল সনদ প্রদান, নিয়ন্ত্রক কাঠামো, গবেষণা, উদ্ভাবন ও তৈরি ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর বিষয়টিও উভয় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তারা উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা উদ্যোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ব্যাপারে একমত হন।
যোগ্যতার / সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি, যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি এবং শিক্ষাক্রমের সমাপকের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তারা গুরুত্ব আরোপ করেন।
‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির আওতায় পর্যটন সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা দুই নেতা ব্যক্ত করেন। তারা একইসাথে সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জ্বালানি সহযোগিতাও তাদের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল। উভয় পক্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ব্যাপারেও সম্মত হন।
বাংলাদেশ বলছে, মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজসমূহ উত্তোলনের জন্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানায়।
অতএব, জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে জাতীয় জ্বালানি কোম্পানি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সহযোগিতার বিষয়েও উভয় দেশ উৎসাহ প্রদান করে।
দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রশংসা করেন দুই নেতা, তারা বর্তমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক সম্পূর্ণ কার্যকর করার অঙ্গীকার করেন।
সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিত্বে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত হন তারা। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য একটি কাঠামোগত রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি (জেসিডিসি) বৈঠক আয়োজনের প্রত্যাশা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে একত্রে প্রশিক্ষণ, কৌশলগত মহড়া এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে সহযোগিতা জোরদারেরও কথা তারা বলেন।
দুই নেতা রোহিঙ্গা সংকট বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মালয়েশিয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করে এবং বাংলাদেশের প্রতি সংহতির ঘোষণা দেন।
রাষ্ট্রপাল মোহাম্মদ আলী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে জানিয়ে দেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের প্রশংসা করে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং চলমান আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে তারা আলাপ করেন। সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ এবং অন্যান্য প্রচলিত এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
জাতিসংঘ ও ওআইসি সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করার অঙ্গীকার করে দুই দেশ। একই সময় তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অবশেষে, তিনি এবং তার প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
