০৭:৪৪ পি.এম
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য গুদামে ধান দিয়েছিল একটি সিন্ডিকেট। খবর অনুযায়ী, নাভজান বেওয়ার স্বামী তিন বছর আগে মারা গেছেন। তার ১৫ শতকের বসতভিটা ছাড়া কোনো জমি নেই। সংসার চলে অন্যের বাড়িতে কাজ করে। বিধবা ভাতা দেওয়ার কথা বলে এলাকার দুলাল নামের এক ব্যক্তি তাকে ব্যাংকে নিয়ে যান। পরে তাকে দুটি চেক বইয়ের পাতার মাধ্যমে দুই দফায় এক হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
যেমন করে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের ছাটবাড়ী গ্রামের এই নারীর নাম উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষক তালিকায় ওঠে এলাকার একটি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে। এই প্রতারণার মাধ্যমে কৃষকের বদলে সরকারী গুদামে নাভজান বেওয়ার নামে ধান দিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ধান ব্যবসায়ীরাও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত।
প্রকৃত কৃষকের বদলে তালিকায় উঠে এসেছে হতদরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমজুরসহ অকৃষকদের নাম। এতে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। খাদ্য ও কৃষি বিভাগ একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে ইয়াবাসহ যুবদল নেতাকে আটক করে পুলিশে দিল জনতা
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নাগেশ্বরীতে চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ৮০৭ জনের কাছে দুই হাজার ৪২৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ধানের দর প্রতি মেট্রিক টন ৩৬ হাজার টাকা। এই জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, একটি চক্র দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুরদের নাম ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার আবেদন করেছে বিভিন্ন সরকারি সহায়তার নামে। পরে লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাইয়ের সময় তালিকায় অর্ধেকের বেশি অকৃষকের নাম এসেছে।
তালিকাভুক্ত অনেকেই জানেন না, তাদের নামে আবেদন হয়েছে। পরে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের ব্যাংক হিসাব খুলে এক থেকে দুই হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দেন। তাদের নামে গুদামে ধান দেওয়ার পর সরকারি অর্থ তুলে নেয় ওই চক্রটি।
কচাকাটা ইউনিয়নের ছাটবাড়ী গ্রামের ১৬ জন ভুয়া কৃষকের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের কারো আবাদি জমি নেই। অথচ সরকারি রেকর্ডে তারা কৃষক হিসাবেই ধরা হয়েছেন এবং খাদ্য গুদামে ধান দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করেছেন।
আরও পড়ুন: ঝিনাইগাতীতে ধান মাড়াইকল উল্টে চালক নিহত, আহত ২
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এলাকার দুলাল মিয়া কৃষি কার্ড, বিধবা কার্ড, ভিজিডি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তার নাম ভাঙিয়ে তাদের ব্যাংকে নিয়ে হিসাব খোলেন এবং ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করান। পরে জনপ্রতি এক থেকে দুই হাজার টাকা তারা হাতে দেন।
ছাটবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আছিয়া জানান, ‘ব্যাংকে সই নিয়ে বাইরে পান খেতে পাঠায় দিছে। পরে ওরা চেক দিয়া টাকা তুলছে। এরপর বাড়িতে এসে এক হাজার টাকা দিয়েছে।’
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, তিনি বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান উৎপাদন করেন। অথচ কখনো সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেননি। তার অভিযোগ, প্রকৃত কৃষক বাদ দিয়ে দরিদ্র মানুষের নাম ব্যবহার করে সিন্ডিকেট সরকারী লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
অভিযুক্ত দুলাল মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘শুধু কচাকাটা নয়, নাগেশ্বরীর সব ইউনিয়নেই কৃষক ধান দেননি। কৃষক ধান বিক্রি করে ব্যবসায়ীর কাছে।’ তিনি দাবি করেন, কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি। তার দাবি, প্রভাবশালী মহলের ‘বড় ভাইদের’ নির্দেশ পালন করছেন।
আরও পড়ুন: কুলিয়ারচরে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন
নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাউছার হাবিব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কৃষি বিভাগের দেওয়া কৃষকের তালিকা অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘স্বল্প সময়ে আবেদনকারী কৃষকদের যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়। কৃষক নন এমন ব্যক্তির নাম থাকলেও তারা ধান দিতে পারবেন না। এসব নাম বাতিল করে পুনরায় লটারির নিয়ম রয়েছে। তবে খাদ্য বিভাগ এসব বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করেনি। তাদের জানা নেই কাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ হচ্ছে।’
উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আট কোটি ৭২ লাখ ২৮ হাজার টাকার ধান সংগ্রহ করা হবে। এই সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
আরও পড়ুন: বুড়িচংয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুই আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন