০৪:১১ পি.এম
ফরিদপুর-রাজবাড়ী - দৌলতদিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কটি মৃত্যু ফাঁদ হিসেবে পরিচিত। ফরিদপুর শহর থেকে গোয়ালন্দ মোড় হয়ে রাজবাড়ী-দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক খণ্ডটি বর্তমানে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন ট্রাক ড্রাইভার মোহন মিয়া মন্তব্য করেন, মহাসড়কের কিছু অংশে রাস্তা ধেবে গিয়ে পুকুরের মতো হয়ে গেছে, কোথাও ৫-১০ ফিট সড়কের বিটুমিন এবং সুড়কি খোয়া বালুর কারণে অতিরিক্ত মাল বোঝাই ট্রাক চলাচলে সড়কের বুক উপচে উঠছে।
কিছু স্থানে সড়কের অর্ধেকাংশ এক পাশে সরে গিয়ে সড়কের মাঝে খালের আকৃতি দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ফেনীতে সাংবাদিকদের ‘মাল্টিমিডিয়া, এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠিত
সরু ও জরাজীর্ণ রাস্তা, একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্স ছাড়া অদক্ষ চালকদের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা।
"নিরাপদ সড়ক চাই" ফরিদপুর অঞ্চলের সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, আমাদের হিসেব অনুযায়ী, গত দেড় বছরে এই ৪০ কিলোমিটার সড়কে প্রায় ৭৪৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি হয়েছে ৫০ জনের। এই তথ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।
রাজবাড়ী ও ফরিদপুর হাইওয়ে পুলিশের বিভিন্ন সূত্র এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৫ বছরে এই রুটে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা এবং সার্বিক নিরাপত্তার চিত্র নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
ফরিদপুর-দৌলতদিয়া ঘাটের দুরত্ব (৪০ কিমি) মহাসড়ক।
আরও পড়ুন: লগি-বৈঠার তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চরফ্যাশনে জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল
বিগত ৫ বছরের পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র
মোট আনুমানিক দুর্ঘটনা ৪৫০ টিরও বেশি
মোট প্রাণহানি (নিহত) সংখ্যা ১৮০ জন।
পঙ্গুত্ব বরণকারী (আহত/পঙ্গু) ৬৫০ জনেরও বেশি (যার মধ্যে চিরতরে পঙ্গু অন্তত দেড় শতাধিক)।
আরও পড়ুন: নোয়াখালী সদর উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা
মোট বিপজ্জনক বাঁক (Black Spots) ১৮ থেকে ২০টি (গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক: ১৫টি)।
সড়কের প্রশস্ততা ও অবস্থাদ্বি-লেনের অত্যন্ত সরু সড়ক, দুপাশে খানাখন্দ ও বিপজ্জনক ঢাল। গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর মধ্যে গোয়ালন্দ মোড়, জমিদার ব্রিজ এলাকা, খানখানাপুর বাজার, ব্রিজ, গোয়ালন্দ বাজার, উজানচর মোড়, দরবার শরীফ এলাকা, পাঁচুরিয়া লিংক সড়ক মোড়গুলো উল্লেখযোগ্য ও বিপদজনক।
এই বিষয়ে কথা হয় রাজাবড়ী ধনছি এলাকার মিনু মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ফরিদপুর-দৌলতদিয়া মহাসড়ক: বেহাল দশা, লক্কড় ঝক্কর গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া এক জনপদ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম রুট হলো ফরিদপুর-দৌলতদিয়া মহাসড়ক। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন, ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, বাস এবং অ্যাম্বুলেন্স এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে।
আরও পড়ুন: বিএনপির বিরুদ্ধে টাকা বিতরণের অভিযোগ জামায়াত প্রার্থীর
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি বর্তমানে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, খানাখন্দ, ফিটনেসবিহীন লক্কড় ঝক্কর গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার, নছিমন, করিমন, ভটভটি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচলের কারণে এক প্রকার ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন বিশেষ প্রতিবেদন তৈরির সময় দেখা গেছে,
৪০ কিলোমিটার মহাসড়কের বর্তমান বেহাল দশা ও মূল সমস্যাসমূহ
সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় চালক-যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে মহাসড়কটির বেশ কিছু গুরুতর সমস্যার চিত্র উঠে এসেছে। কারণগুলো উল্লেখ করা হলো,
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় প্রবাসী আকাশ মিয়ার বিরুদ্ধে বানোয়াট কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ করায় একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে জখম
খনাখন্দ ও জরাজীর্ণ রাস্তা। বড় বড় বাঁক, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিনের সংস্কারের অভাব এবং অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচলের কারণে পিচ উঠে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত।
সামান্য বৃষ্টিতেই সেসব গর্তে পানি জমে যায়, যার ফলে চালকরা রাস্তার সঠিক অবস্থা বুঝতে না পেরে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন।
অনিয়ন্ত্রিত ভটভটি, করিমন, নছিমন, ইজিবাইক ও নছিমন-করিমঞ্জির দৌরাত্ম্য বহুগুণে বেড়ে গেছে।
মহাসড়কে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দুলকি চালে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, এবং থ্রি-হুইলার। দ্রুতগতির ভারী বাস বা ট্রাকের সঙ্গে এই কমগতির যানবাহনগুলোর সংঘর্ষই অধিকাংশ ছোট-বড় দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে পল্টন হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বি-ক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
এই বিষয়ে, ফরিদপুরের ট্রাফিক সার্জেন্ট প্রশান্ত কুমার বলেন,
ট্রাফিক আইনের শিথিলতা আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও ওভারটেকিং প্রবণতা দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। নির্দিষ্ট লেন ব্যবস্থার অভাব এবং চালকদের বেপরোয়া গতিতে ওভারটেক করার মানসিকতা মহাসড়কটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সবারই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা উচিত।
লক্কড় ঝক্কর গাড়ি ও কালো ধোঁয়া: পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে শান্ত পরিবেশের জন্য।
ফরিদপুর-দৌলতদিয়া মহাসড়কের পরিবেশগত সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। রাস্তায় চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন লক্কড় ঝক্কর বাস, ট্রাক এবং লরি থেকে অবাধে নির্গত হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া। কিন্তু দেখার কেউ নেই।
বায়ু দূষণের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে চরমভাবে। এই সমস্ত পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্ষতিকর কণা (Particulate Matter) স্থানীয় বাতাসকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তুলছে।
বায়ু দূষন ও পরিবেশ নিয়ে কথা বলছেন, ডাঃ মোঃ আবজাল হোসেন। তিনি বলেন, দিন দিন সড়কে যানবাহনে চলাচলের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। মহাসড়কের দুই পাশের বাসিন্দা, পথচারী এবং যাত্রীরা এই বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করছেন। এর ফলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, এবং ফুসফুসের জটিল রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
দৃশ্যমানতার অভাব ও কম নয়। এ অভাব এখন দৃশ্যমান।
ফরিদপুর বিআরটিএ সহকারী পরিচালক এই বিষয়ে বলেন, অনেক সময় লক্কড় ঝক্কর গাড়িগুলোর পেছনের লাল বাতি নষ্ট থাকে এবং অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে পেছনের গাড়ির চালকরা সামনের রাস্তা দেখতে না পেয়ে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন।
ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি
মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত গতি, ভাঙা রাস্তা আর ফিটনেসবিহীন গাড়ির ত্রিমুখী প্রভাবে প্রায়শই ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ।
সামান্য বৃষ্টি বা কুয়াশায় এই সড়কে দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় রূপ নিয়েছে। স্থানীয় হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে প্রায়ই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যেখানে মা-শিশুসহ পুরো পরিবার নিভে যাওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে।
আহতরা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার আগেই ভাঙা রাস্তার জ্যামে পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
এই বিষয়ে সচেতন সমাজের মুরব্বিরা বলছেন, দুর্ঘটনা এড়াতে ও পরিবেশ রক্ষায় জরুরি প্রতিকার ও করণীয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও কালো ধোঁয়া রোধে কড়া অভিযান। বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে যেসব গাড়ি থেকে কালো ধোঁয়া বের হয় এবং ফিটনেস নেই, সেগুলোকে অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত বা মহাসড়ক থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে।
সার্ভিস লেন নির্মাণ: মূল মহাসড়কের পাশে ধীরগতির যানবাহন (অটোরিকশা, নছিমন, করিমন) চলাচলের জন্য অবিলম্বে পৃথক ‘সার্ভিস লেন’ বা আলাদা রাস্তা তৈরি করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
নিয়মিত সড়ক সংস্কার: খানাখন্দ দ্রুত মেরামত করে মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে আরও বেশি তৎপর ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধি: চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি না চালানোর মানসিকতা তৈরি করতে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও প্রচারণা চালাতে হবে।
ফরিদপুর-দৌলতদিয়া মহাসড়কের এই রুগ্ন দশা ও পরিবেশদূষণ কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় এক অন্তরায়।
সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্মল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দ্রুত, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ফরিদপুর - মাদারীপুর জেলার হাইওয়ের পুলিশ সুপার জনাব আহম্মেদ হমায়ুন বলেন,
এই বিষয়ে, ভবিষ্যতে বহু পদক্ষেপ হাতে নিয়ে সকল সমস্যা সমাধানে আন্তরিক বলে, ইনকিলাবকে জানান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন