প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
৭৪ বছর পর আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।
এই দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক বিমানে উড্ডয়নের আগে যাত্রীদের জন্য নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়ার নিয়ম চালু হয়।
তাহলে আবিষ্কারটি বিমান চলাচলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষকেরা জানান, সোনার প্রযুক্তি সমৃদ্ধ পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোনের সাহায্যে পুয়ের্তো রিকোর উপকূলের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় দুই হাজার ফুট বা ৬১০ মিটার নিচে ক্লিপার এনডেভার নামের বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এটি প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের ডগলাস ডিসি-৪ মডেলের বিমান, যা ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর একাধিক ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। পাইলট বাধ্য হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে জরুরি অবতরণের চেষ্টা করলে বিমানটি পানিতে আছড়ে পড়ার পর দ্রুত ডুবে যায়।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে বিমানে থাকা সবার বেঁচে থাকার আশা ছিল। কিন্তু বিমানটি দ্রুত পানির নিচে তলিয়ে যেতে শুরু করলে যাত্রীরা লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ ভেলা খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বিমানে থাকা ৬৪ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রু মিলিয়ে মোট ৬৯ জনের মধ্যে মাত্র ১৭ জন প্রাণে বাঁচেন।
অবশ্যই এই দুর্ঘটনার পরে বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। এরপর থেকে প্রতিটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে উড্ডয়নের আগে যাত্রীদের নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার নিয়ম চালু হয়। পাশাপাশি বিমানে উন্নতমানের ভাসমান নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখতে বলা হয় এবং যাত্রীদের তাদের ব্যবহার সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়াও অপরিহার্য হয়।
বর্তমানে পুরো বিশ্বের সকল বাণিজ্যিক ফ্লাইটেই কেবিন ক্রুরা উড্ডয়নের আগে যাত্রীদের জরুরি বের হওয়ার পথ, লাইফ জ্যাকেটের অবস্থান এবং তাদের ব্যবহার কীভাবে করতে হয়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
ধ্বংসাবশেষের অনুসন্ধানের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। তাদের সঙ্গে ছিল ডিসকভারি চ্যানেলের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'এক্সপেডিশন আননোন' এবং আরো কিছু প্রতিষ্ঠান। গত মাসে অনুসন্ধানকারী দল স্বয়ংক্রিয় সোনার ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে বিমানের মূল অংশ ও লেজ শনাক্ত করে। পরে সেগুলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি ক্লিপার এনডেভারের ধ্বংসাবশেষ।
এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সভাপতি রাস ম্যাথিউস বলেন, "এই আবিষ্কার তাদের আনন্দিত করলেও, ৭৪ বছর আগে সেখানে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথাও গভীরভাবে মনে পড়ে।" তিনি জানান, ২০১৯ সালে এই দুর্ঘটনা নিয়ে তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তখন তিনি জানতে পারেন, দুর্ঘটনার পর বিমানের একটি লাগেজের ট্যাগ সাগরে ভেসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূলে পৌঁছেছিল। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা মানুষের স্মৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে দেখে তিনি বিস্মিত হন।
পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সিভিল অ্যারোনটিক্স বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কাজ শুরু করেন। গবেষকেরা পুয়ের্তো রিকোতে অনুষ্ঠিত একটি প্রকাশ্য শুনানির নথি খুঁজে পান। সেখানে দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষকারী বিমানবাহিনীর পাইলটদের আঁকা একটি মানচিত্র ছিল, যা সন্ধানের এলাকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকেরা ঐতিহাসিক নথি, দুর্ঘটনার সময়কার আবহাওয়ার তথ্য এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ১০ বর্গ নটিক্যাল মাইলের একটি এলাকা চিহ্নিত করেন। তাদের ধারণা ছিল, ধ্বংসাবশেষ ওই এলাকাতেই রয়েছে। ২০২৪ সালে একবার অনুসন্ধান শুরু হলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে অভিযান বন্ধ করতে হয়, তবে গবেষকেরা হাল ছাড়েননি। দুর্ঘটনার ৭৫তম বার্ষিকীর আগে আবার অনুসন্ধানে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে চলতি বছরের ২ জুন অনুসন্ধান এলাকায় প্রথমবার ড্রোন উড়ানোর পর ধ্বংসাবশেষের অবস্থান শনাক্ত হয়। দেখা যায়, বিমানটি সমুদ্রের তলদেশে দুটি অংশে ভেঙে পড়ে আছে। পরে তোলা উচ্চমানের ছবিতে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি ক্লিপার এনডেভারের ধ্বংসাবশেষ। ছবিতে বিমানের গায়ে থাকা প্যান অ্যামের লোগো এবং 'ক্লিপার এনডেভার' নাম এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
'এক্সপেডিশন আননোন' অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জশ গেটস বলেন, "আজ মানুষ বিমানে ওঠার আগে যে নিরাপত্তা নির্দেশনা পান, তার পেছনে ক্লিপার এনডেভারের দুর্ঘটনার বড় ভূমিকা রয়েছে।" তার ভাষায়, ৭৫ বছর আগে ওই দুর্ঘটনায় যা ঘটেছিল, সেটিই আজকের বিমান ভ্রমণকে আরো নিরাপদ করেছে। তিনি আরো বলেন, ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার পুরো ঘটনাটি অনুসন্ধান জাহাজ থেকে সরাসরি দেখার সুযোগ তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়া অন্য বিমানগুলোর সন্ধান পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন আশা তৈরি করবে। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ৩৭০। ২০১৪ সালে ২৬৯ জন আরোহী নিয়ে বিমানটি নিখোঁজ হয়। ভারত মহাসাগরে বহুবার অনুসন্ধান চালানো হলেও এখন পর্যন্ত এর ধ্বংসাবশেষের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ক্লিপার এনডেভারের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার পুরো অভিযান নিয়ে 'এক্সপেডিশন আননোন' অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ পর্ব আগামী শরৎকালে প্রচারিত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন