১২:১৯ পি.এম
ভারতে একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ফলাফলে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে এবার অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছে জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের রাজনৈতিক আন্দোলন 'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) সমর্থকরা।
গত শনিবার (২০ জুন) তীব্র গরম ও পুলিশের বিভিন্ন বাধা উপেক্ষা করে শত শত শিক্ষার্থী ও তরুণ দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে অবস্থান নিয়েছেন। গত রোববার (২১ জুন) দ্বিতীয় দিনেও নতুন নতুন বিক্ষোভকারী যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের পরিধি আরও বড় হয়েছে। দিন-রাত সেখানেই কাটাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ দিপকে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্প্রতি স্নাতক সম্পন্ন করা এই তরুণ চলতি মাসে ভারতে ফিরে এসে অনলাইনভিত্তিক এই আন্দোলনকে রাজপথে নিয়ে আসেন।
আরও পড়ুন: মেলান্দহে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪
ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ২৫ বছরের কম বয়সী। ঘন ঘন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নম্বরের গরমিলের কারণে পড়াশোনা ও চাকরি খোঁজার চাপে আগে থেকেই মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়া তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
দীপকের দল 'ককরোচ জনতা পার্টি' (ককরোচ পিপলস পার্টি বা সিজেপি) সেই ক্ষোভ ও হতাশাকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তুলেছে।
মূলত গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র ধারণার জন্ম হয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার যুবকদের একটি অংশকে 'ককরোচ' ও 'পরজীবী' বলে মন্তব্য করেন।
যুবসমাজকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া ওই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিজিৎ দিপকে লেখেন, 'সব তেলাপোকা যদি একত্রিত হয়, তাহলে কী হবে?' এরপরই বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। বর্তমানে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীর সংখ্যার চেয়েও বেশি।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী নয়াপল্টনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সমাবেশে যোগদান
দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর গত ৬ জুন নয়াদিল্লিতে দলের প্রথম প্রতিবাদ সমাবেশ করে ককরোচ জনতা পার্টি। সেই সমাবেশ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এরপর থেকে সেই বিক্ষোভ ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েকদিনে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও নাগপুরসহ বেশ কয়েকটি বড় শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এবার শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে শুরু হলো অবস্থান ধর্মঘট। ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করা ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শচীন কুমার বলেন, 'এক বছর কঠোর পরিশ্রমের পর পরীক্ষাটি বাতিল হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।' তার ভাষায়, 'শিক্ষার্থীরা হতাশায় ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনছে না।' এরপর থেকে তিনি আর বই হাতে নেননি।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই দফা পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সামনে এসেছে। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা প্রায় হারিয়ে গেছে।
শনিবার সন্ধ্যা থেকে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিক্ষোভস্থলে সাময়িকভাবে পানি ও খাবারের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এসব বাধা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ গান গেয়ে, কেউ রাজনৈতিক আলোচনা করে রাত কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: সৌদির সড়কে একসঙ্গে ঝরলো ৭ বাংলাদেশির প্রাণ
অভিজিৎ দিপকে ও তার সমর্থকদের দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা যন্তর মন্তর ছাড়বেন না। তাদের মতে, এটি কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে তরুণদের নেতৃত্বে এত বড়, সংগঠিত এবং ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্রতিবাদ খুব কমই দেখা গেছে। ফলে 'ককরোচ জনতা পার্টি'র এই আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন