০২:৩৬ পি.এম
ঢাকা, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ : বিভিন্ন বিমান সংস্থা বিলাসবহুল আসন সংযোজন, মিশেলিন তারকাখচিত রেস্তোরাঁর শেফদের দ্বারা বিশেষ খাবারের মেন্যু তৈরি এবং অভিজাত যাত্রীদের জন্য আধুনিক লাউঞ্জ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ভ্রমণকারীদের মধ্যে উন্নত ও বিলাসবহুল সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে ভবিষ্যতে মুনাফা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে।
এ কৌশল প্রয়োগের ফলে বিভিন্ন ফ্লাইটে সাধারণ বা ইকোনমি শ্রেণির আসনের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে। বিমান সংস্থাগুলোর ধারণা, ভবিষ্যতে প্রায় ৭০ শতাংশ যাত্রী বাড়তি সুবিধাসম্পন্ন আসন কিংবা বিজনেস ও ফার্স্ট ক্লাসের মতো উন্নত সেবা বেছে নেবেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে উড়োজাহাজের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তবে বিমান সংস্থাগুলো মনে করছে, যাত্রীদের কাছে উন্নত সেবা বিক্রির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব।
আরও পড়ুন: বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার চাপ, আলোচনা হতে পারে
পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিমান পরিবহন অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভলোদিমির বিলটকা মন্তব্য করেন, "একটি বিজনেস ক্লাসের আসনের জন্য সাধারণ ইকোনমি ক্লাসের চারটি আসনের সমপরিমাণ জায়গা প্রয়োজন হতে পারে। অথচ বিজনেস ক্লাসের প্রতিটি আসনের ভাড়া সাধারণ আসনের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি নির্ধারণ করা যায়।"
তিনি এএফপিকে আরও বলেন, "বিমান সংস্থাগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই উন্নত ও বিলাসবহুল সেবায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে আসছে। কারণ, এসব সেবা থেকে মুনাফার হার অনেক বেশি।"
সাম্প্রতিক প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের প্রিমিয়াম শ্রেণির টিকিট বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি সাধারণ কেবিনের আয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে চার শতাংশ বেশি।
বিমান সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উড়োজাহাজের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভ্রমণ খাতে নানা জটিলতা তৈরি হলেও প্রিমিয়াম সেবার আয় প্রতিষ্ঠানটির জন্য ইতিবাচক দিক হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা, ভরি কত?
আমেরিকান এয়ারলাইনস জানায়, বর্তমানে তাদের মোট আসনের প্রায় ৩০ শতাংশ প্রিমিয়াম শ্রেণির হলেও এসব আসন থেকে টিকিট বিক্রির মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে।
সাধারণ কেবিন ও বিজনেস ক্লাসের প্রচলিত পার্থক্যের বাইরেও এখন যাত্রীরা বাড়তি পায়ের জায়গা কিংবা উড়োজাহাজের সামনের দিকে বসে সবার আগে নামার সুবিধার জন্য সর্বোচ্চ ২০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন।
গত জুলাইয়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ‘ইকোনমি প্লাস’ নামে নতুন একটি সেবা চালুর ঘোষণা দেয়। এ সুবিধার আওতায় যাত্রীরা পাশাপাশি তিনটি আসনের মাঝের আসনটি খালি রাখার সুযোগ পাবেন। ২০২৬ সালের শেষ দিকে কয়েকটি ফ্লাইটে পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বরে জেটব্লু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ‘ব্লুফার্স্ট’ নামে নতুন ফার্স্ট ক্লাস সেবা চালুর ঘোষণা দেয়।
আরও পড়ুন: পুঁজিবাজারে আইপিও খরা কাটানোর লক্ষ্যে ছয় কোম্পানির আবেদন
জেটব্লুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোয়ানা গেরাঘটি বলেন, "যাত্রীরা এখন আগের তুলনায় উন্নত ও বিলাসবহুল ভ্রমণ অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।"
প্রিমিয়াম আসনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে
ভ্রমণবিষয়ক সংবাদমাধ্যম স্কিফটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোতে প্রিমিয়াম আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এ প্রবৃদ্ধি সাধারণ আসনের বৃদ্ধির হারের দ্বিগুণেরও বেশি।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনস এএফপিকে জানিয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তাদের প্রিমিয়াম আসনের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়তি সুবিধাসম্পন্ন আসন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্যে যাত্রীদের কনুই রাখার জন্য অতিরিক্ত জায়গাসম্পন্ন আসনও রয়েছে।
আরও পড়ুন: বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলার ক্রিপ্টো চুরি, বীমা কোম্পানির নজরদারি বৃদ্ধি
ডেল্টা এয়ারলাইনস তাদের ‘ডেল্টাওয়ান’ সেবায় নতুন করে বিনিয়োগ করেছে। এ সেবায় থাকছে উন্নতমানের ওয়াইন, ওয়াগিউ বার্গারের মতো বিশেষ খাবার এবং বিনোদনের জন্য বড় পর্দা।
খাবারের মেন্যু তৈরিতে ডেল্টা যুক্তরাজ্যের মিশেলিন তারকাখচিত রেস্তোরাঁর শেফ সাইমন হালস্টোন এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত সোমেলিয়ার আন্দ্রেয়া রবিনসনের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের নতুন এ সেবা এয়ারবাস এ৩৫০ মডেলের উড়োজাহাজে চালুর পরিকল্পনা করছে। এসব উড়োজাহাজে প্রায় ১৫০টি প্রিমিয়াম আসন এবং ১৬১টি ইকোনমি শ্রেণির আসন থাকবে।
ডেল্টার অনবোর্ড স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একরেম দিমবিলোগলু বলেন, "২০ বছর আগে উড়োজাহাজের ৯০ শতাংশ আসনই ছিল সাধারণ কেবিনের।"
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির উদ্যোক্তা বাছাই শুরু হচ্ছে কাল
তিনি জানান, ডেল্টার কোনো কোনো ফ্লাইটে অদূর ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম আসনের সংখ্যা মোট আসনের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো বড় বিমান সংস্থা পুরোপুরি ইকোনমি শ্রেণির আসন বাদ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেনি।
গত অক্টোবরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ঘোষণা দেয়, তাদের দুই তলাবিশিষ্ট এ৩৮০ উড়োজাহাজের ওপরের তলায় শুধু প্রিমিয়াম শ্রেণির আসন রাখা হবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের তিনটি প্রধান বিমান সংস্থা জোট—স্কাইটিম, ওয়ানওয়ার্ল্ড ও স্টার অ্যালায়েন্স এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোর মোট আসনের মধ্যে বর্তমানে প্রিমিয়াম আসনের হার ১৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোরে ২৪ ঘণ্টায় ট্রাক পৌঁছাবে চীনে: বাণিজ্যমন্ত্রী
প্রিমিয়াম সেবার আওতায় আরও যুক্ত হচ্ছে ফ্লাইটে ওঠার আগেই পছন্দমতো খাবার বেছে নেওয়া এবং বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধা।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিমান সংস্থা নতুন ও আধুনিক যাত্রী লাউঞ্জ নির্মাণ এবং পুরোনো লাউঞ্জের সৌন্দর্যবর্ধনে বিনিয়োগ করছে। একসময় স্বল্পমূল্যের সেবার জন্য পরিচিত সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে বিমান সংস্থাগুলোর এভাবে উচ্চমূল্যের সেবা গ্রহণে সক্ষম যাত্রীদের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠার ফলে স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও জ্বালানির বাড়তি দাম সব বিমান সংস্থার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন