প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চার দিনের কন্যাসন্তানকে বুকে ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন ২০ বছরের সোহানা বেগম। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তার সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পরে বাড়ি ফেরার পর তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের সমস্যা শুরু হয়। একে একে কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলতে থাকে। আট ব্যাগ রক্ত এবং দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রাণে বাঁচলেও সে জরায়ু হারায়। একটি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সে চিরতরে মা হওয়ার ক্ষমতা হারানোর শিকার হয়।
একইভাবে কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি ইউনিয়নের বনগ্রামের বাসিন্দা কামরুজ মোল্যার অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে সোহানা বেগমকে গত ৪ জুলাই নড়াইল শহরের মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
সেদিনই তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। চার দিন পর ৮ জুলাই তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরেই সোহানার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে তাকে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হন।
চিকিৎসায় অবহেলার কারণে সোহানার এমন পরিণতি হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। তারা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নড়াইলের জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর ২৫ জুলাই জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিকে অভিযান চালায়। অভিযানে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়।
তবে সোহানার ঘটনা নড়াইলে একান্ত বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। কোথাও সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে রোগীর প্রতি অবহেলা, আবার কোথাও অদক্ষ জনবল দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানেও অপারেশন থিয়েটারে রোগীর পাশে টিকটক ভিডিও ধারণ করে, চিকিৎসক-নার্স ছাড়াই রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত বছরের ২৮ আগস্ট লোহাগড়া উপজেলার প্রত্যাশা ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে রোগীর সঙ্গে টিকটক ভিডিও ধারণ করে এক নার্স। পরে বিষয়টি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে।
এদিকে চলতি বছরের ২৫ জুলাই কালিয়া উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুটি ক্লিনিককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রোগী ভর্তি থাকা অবস্থায় কোনো চিকিৎসক বা নার্সের উপস্থিতি না থাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে কার্যক্রম চালানো এবং অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেস্থেশিয়া প্রদানকারী চিকিৎসকের তথ্য সংরক্ষণ না করার অভিযোগে তাদের জরিমানা করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রায় একই—অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরই প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এরপর সাধারণত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, জরিমানা কিংবা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার কার্যক্রম হয়ে থাকে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইলে মোট ১১৮টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৯০টি চালু আছে। বাকি ২৮টির কিছু সিলগালা করা হয়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্যোগে বন্ধ করে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানাচ্ছে, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো নিয়মিতভাবে তদারকি করা হয়। চলতি বছরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ১০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে সিলগালা কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের নড়াইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এসএম সাজ্জাদ রহমান বলেন, ‘ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে আমরা প্রতিমাসে সভা করে মালিকদের সচেতন করি। কিন্তু এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। অনিয়মে থাকা ক্লিনিকগুলোকে আমরা নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রেখেছি। যারা অনিয়মে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হবে।’
তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অভিযোগ উঠলেই অভিযান পরিচালনা করা হয়—এমন অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা ১০টি ক্লিনিক সিলগালা করেছি। তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্লিনিক তাদের কার্যক্রম সংশোধন করেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে তিনটি ক্লিনিককে জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কোনো অব্যবস্থাপনা দেখা দিলেও ক্লিনিক চলতে দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব সময়ই অভিযান চলে। তবে যেসব বিষয়ে অভিযোগ ওঠে, সেগুলোর প্রতি সবার নজর থাকে। এ কারণে বিষয়গুলো বেশি জানাজানি হয়।’
সিভিল সার্জন আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য বিষয়ে খুবই গুরুত্ব প্রদান করেছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষ যেন প্রতারিত না হয় এবং মানসম্মত সেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন