০১:৪৯ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রায় চার মাসব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। চুক্তির প্রাথমিক যে রূপরেখা এসেছে, তা স্বাগতম জানানো হলেও এর মধ্য দিয়ে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতা সামনে এসেছে।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক- তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে।
সমালোচকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে একটি বড় কৌশলগত ভুল ছিল। তারা বলছেন, আইনগত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিচালিত এই অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকোটকে সমর্থন জানাল আরব জোট, কোণঠাসা নেতানিয়াহু
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও প্রকাশ হয়নি। তবে ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী, ট্রাম্প যে কঠোর শর্তগুলো আদায়ের কথা বলেছিলেন, তার বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আপসের সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করবে এবং ইরানকে ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ করতে হবে। তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন। পাশাপাশি দাবি করেছিলেন, ইরানকে কোনওভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হবে না এবং দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে।
তবে যুদ্ধ শেষে দেখা যাচ্ছে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এখনও টিকে আছে। পারমাণবিক ইস্যুতে আগামী দুই মাস ধরে আলোচনার কথা থাকলেও বর্তমান চিত্রে এটি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির কাছাকাছি কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা ওই চুক্তিকে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ২০১৮ সালে বাতিল করেছিলেন। তিনি এটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, ওই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দিচ্ছে এবং দেশটিকে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতা বন্ধ করতে বাধ্য করছে না। তবে সামরিক সংঘাতের পর এখন প্রায় একই ধরনের সমঝোতার পথে যেতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
আরও পড়ুন: সন্ধ্যা হলেই বন্ধ চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষার্থীদের জন্য সংকট পরিবহনেও
হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের একমাত্র বড় সাফল্য? যুদ্ধবিরতির রূপরেখায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাকে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমতে পারে এবং তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া। ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করেছিল। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরান দেখিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
চার মাসের যুদ্ধে ইরানও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির সামরিক অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুদ্ধ শেষে ইরান নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের দীর্ঘদিনের সংকটগুলোও এখনও রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মুদ্রার মূল্যহ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ দেশটিকে দুর্বল অবস্থায় রেখেছে। তবে যুদ্ধের আগে যে কূটনৈতিক অবস্থান ছিল না, সংঘাতের পর ইরান সেটি ফিরে পেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আরও পড়ুন: টেকনাফে মানবপাচারকারীদের গুলিতে আহত সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের মৃত্যু
ইরান দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যেও তারা টিকে থাকতে পারে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতাও তারা প্রমাণ করেছে।
এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিপুল সামরিক শক্তি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি।
এতে বিশ্বের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রভাব নিয়ে নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি সামরিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নও জরুরি হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের আগে দুর্বল ছিল ইরান। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে। ইসরায়েলের অভিযানে হামাস ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত সরকারও পতনের মুখে পড়ে।
আরও পড়ুন: টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়ে সেনাসদস্য আহত
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ এবং অর্থনৈতিক সংকট দেশটিকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর ইরান নতুন করে দর-কষাকষির অবস্থানে ফিরেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- ভবিষ্যতে যদি ইরান আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন