০৬:৫৭ পি.এম
হরমুজ প্রণালির সংকট সম্পর্কে নজিরবিহীন ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’ (সিআরএস)। এই সংস্থা সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালির সার্বিক নৌ-চলাচল ব্যবস্থার প্রশাসনিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে।
তবে, এর বিকল্প হিসেবে ওয়াশিংটন অঞ্চলটিকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে, এই দুই চরমপন্থী বিকল্প ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
নতুন নীতি পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর এবং আগ্রাসী মনোভাব রয়েছে। তিনি কেবল প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে আহ্বান জানিয়েছেন তা নয়, বরং গত কিছু মাস ধরে এই অঞ্চলের ওপর একক কর্তৃত্বের দাবিও জানিয়ে আসছেন। ‘‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’’ নামে উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় চলাচল করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তিনি পরবর্তীতে দাবি করেছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ দিয়ে গোপন সামরিক ও বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজ পারাপার করছে।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে কৃষককে কুপিয়ে জখম, প্রধান আসামি জাকির গ্রেফতার
এছাড়া, ট্রাম্প এই প্রণালিকে সুরক্ষিত রাখার অজুহাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ২০ শতাংশ করারোপের প্রস্তাবনাও দিয়েছেন। তিনি এমনকি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ঘোষণা করার মতো হুমকিও দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক আইন এবং এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কিত কিছু বাস্তব শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোন সমঝোতায় পৌঁছায় অথবা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই লড়াই চালিয়ে যেতে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন কেবল একজন মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই রূপরেখার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার ব্যয় মেটাতে ট্রানজিট ফি গ্রহণ করার কথা ভাবতে পারে। তবে, এই ধরনের একক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৈশ্বিক মিত্রদের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিশাল বিচ্যুতি সৃষ্টি করবে।
এছাড়া, তুরস্ক, ভারত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পাশের উপসাগরীয় আরব দেশগুলো স্বাধীন ও বাধাহীন নৌ-চলাচলের পক্ষপাতি। তারা এমন কোনো একক নিয়ন্ত্রণ চায় না যা ভবিষ্যতে নতুন সামরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, মার্কিন বাহিনীকে স্থায়ী অবস্থান বজায় রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতার প্রয়োজন, তা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মরণপণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
মার্কিন একক কর্তৃত্বের বাইরে একটি আন্তর্জাতিক বা যৌথ সহযোগিতা ব্যবস্থা গঠনের সম্ভাবনাকেও প্রতিবেদনটি নাকচ করেনি। মালাক্কা প্রণালির সফল মডেলের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে একটি বহুপক্ষীয় তহবিল বা ব্যবস্থাপনা পরিষদ গঠন করতে পারে, যা এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে সচল রাখতে সহায়তা করবে। এই পদ্ধতিতে কোনো দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন না করেই আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন: সারজিস আলম: গণহত্যাকারী হাসিনার অলীক ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসবে না
তবে, এতে চরম অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি একেবারে হঠাৎ করে এই অঞ্চল থেকে তাদের সামরিক মনোযোগ সরিয়ে নেয় বা নিজেদের অবস্থান সংকুচিত করে, তাহলে হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা শুরু হতে পারে। এর ফলে, ইরান ও মার্কিন বাহিনীর পাল্টা-পাল্টি হামলায় বাণিজ্যিক জলপথটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে মাত্র ২২ নটিক্যাল মাইল চওড়া হলেও এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি অতিসংবেদনশীল পয়েন্ট। বিশ্বের প্রতি চার ব্যারেল সমুদ্রবাহিত তেলের অন্তত এক ব্যারেল এই সরু পথ দিয়ে যায়। তাই এই অঞ্চলের সামান্যতম অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম চাকা মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যা মূলত এশীয় এবং ইউরোপীয় আমদানিকারক দেশের অর্থনীতিকে ধসাতে পারে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কে করবে, সেটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপরই নয়, বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণে একটি প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে।
আরও পড়ুন: জিয়া সেদিন তাহেরের সাথে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে ফিরে আসতেন না: ব্রি. সাখাওয়াত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন