০৭:৩৯ এম
বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের মূল্যচাপ, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানিসংকটের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে, নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প খাত ব্যাপক চাপের সম্মুখীন হবে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইতিমধ্যে লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের কারণে কারখানাগুলোকে ব্যয়বহুল জেনারেটরের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তবে উৎপাদন খরচ আরো বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্টসহ প্রায় সব শিল্প খাতের উপর এর প্রভাব পড়বে।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কালুরঘাট, নাসিরাবাদ ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে কৃষককে কুপিয়ে জখম, প্রধান আসামি জাকির গ্রেফতার
কয়েক বছর ধরে ডলার সংকট, এলসি খোলায় কড়াকড়ি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি হওয়ার ফলে উৎপাদন আগেই ব্যাহত হচ্ছিল। উপরন্তু, গত কয়েক মাসে অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিবহন খরচ এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
শিল্প মালিকরা বলছেন, আয় বা মুনাফার মার্জিন না বাড়লেও প্রতিনিয়ত উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কারখানা চালানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।
তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ হলো একটি মৌলিক উৎপাদন উপকরণ। এর মূল্য বৃদ্ধি পেলে সুতা কাটা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি, রড, সিমেন্ট, ভারী ধাতু এবং রাসায়নিকসহ সব ধরনের শিল্পপণ্যের উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে প্রধান ক্ষোভের জায়গা হলো, টাকা দিয়েও মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদনসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভারী শিল্পে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফার্নেস বা স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইনের যে ক্ষতি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে লাখ লাখ টাকা অপচয় হয়।
আরও পড়ুন: সারজিস আলম: গণহত্যাকারী হাসিনার অলীক ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসবে না
ব্যয়বহুল জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা। এতে ডিজেলের জন্য বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। প্রিমিয়ার সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক গোলাম কিবরিয়া বলেছেন, 'দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা এখন কারখানায় বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে চড়া দামে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যে সরকার যদি আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, তবে তা হবে গোদের ওপর বিষফোড়া।'
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতির কারণে পশ্চিমা ক্রেতারা পোশাক কেনা ও ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা যেমন কমেছে, তেমন বিদেশি ক্রেতারা প্রতিনিয়ত পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ বাড়াচ্ছেন।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার ও দাম কমছে, অন্যদিকে দেশের ভিতরে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এই দুই বিপরীতমুখী চাপের কারণে তৈরি পোশাক খাত এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নানামুখী খরচের এই বোঝার ওপর নতুন করে বিদ্যুতের বাড়তি দাম বহন করার সক্ষমতা এই খাতের নেই।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি রফিক চৌধুরী বলেছেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে বায়াররা পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সব কিছুই একসঙ্গে বাড়ছে। এই অবস্থায় বিশ্ববাজারে টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
আরও পড়ুন: জিয়া সেদিন তাহেরের সাথে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে ফিরে আসতেন না: ব্রি. সাখাওয়াত
একই সুরে কথা বলেছেন ক্লিফটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, 'দেশে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দাম বাড়ার বিষয়ে বিদেশি ক্রেতাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা বাড়তি দাম পরিশোধ করেন না। তাই উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তার পূর্ণ চাপ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হয়।'
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব দেশের ভারী শিল্প ও নির্মাণ খাতেও পড়েছে। বিশেষ করে রড, সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের বাজার দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রয়েছে। ডলার সংকটের ফলে কাঁচামাল ও স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ বেড়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে ভারী শিল্পগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজনও হয়। সেজন্য নতুন বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিটি এই খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) ইতিমধ্যেই বিদ্যুতের বাড়তি মূল্যহার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। এই সংগঠনটির মতে, আবাসন ও অবকাঠামো খাতের স্থবিরতার কারণে রড-সিমেন্টের বিক্রি কমে গেছে। এই অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে। ফলে নির্মাণ সামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেও চলে যেতে পারে এবং সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অন্যতম শর্ত হলো সাশ্রয়ী এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। কিন্তু বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের ও গ্যাসের দাম যেমন বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি পর্যাপ্ত সরবরাহও মিলছে না। ফলে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজার সাংবাদিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আশেক উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শিল্প খাত সচল রাখতে সরকারকে ভর্তুকি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যদি শুধুমাত্র রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বারবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার পুনর্বিবেচনা কিংবা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, কর্মসংস্থান রক্ষা, শিল্পায়নের গতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন অব্যাহত রাখতে রপ্তানিমুখী এবং ভারী শিল্প খাতের জন্য সহনীয় বিদ্যুতের মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন