০১:১৯ পি.এম
জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস/আইএসআইএস)-এর সদস্যপদ গ্রহণের অভিযোগে এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার দায়ে সাতজন ফরাসি নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড প্রদান করেছে ইরাকের একটি আদালত। বাগদাদের কারখ ফৌজদারি আদালত গত ২৭ অক্টোবর এ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (যা ইরাকি আইন অনুযায়ী ২০ বছর কারাদণ্ডের সমতুল্য) এবং সপ্তম আসামিকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত ফরাসি নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন লাখদার সেবুয়াই, আদেল বু আউন, আনাস আব্দুল রহমান, জিয়াদ আহমদ, মেহদি সিদা এবং বেঞ্জামিন ভ্যান হ্যান (যাবজ্জীবন) এবং ২৪ বছর বয়সী আমজা বেনাবেদ (১৫ বছর কারাদণ্ড)। আদালত তাদেরকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে জানায়, তারা ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, ইরাক ও সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করা এবং অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি দেয়ার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে :
আরও পড়ুন: চীনে প্রতিষ্ঠানের ঋণচাপে সংকট
ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী, জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বিচারক আসামিদের কম বয়সের বিষয়টি বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
এই সাজাপ্রাপ্তরা সিরিয়ার কুর্দিশ ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি থাকা ৪৭ জন ফরাসি নাগরিকের একটি বড় দলের অংশ ছিলেন, যাদের গত বছর বিচারের জন্য মার্কিন ও ইরাকি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ইরাকে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
রায় ঘোষণার সময় ফরাসি দূতাবাসের প্রতিনিধি এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামিরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় পাবেন।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে আইএসআইএস তাদের খেলাফত ঘোষণা করার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক এ জঙ্গি গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। ২০১৯ সালে তাদের আঞ্চলিক পতনের পর থেকে হাজার হাজার বিদেশি জঙ্গি ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছে, যাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা চলছে।
আরও পড়ুন: ইরান: যুক্তরাষ্ট্রেকে একতরফা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মনোভাব বাদ দিতে হবে
ফ্রান্সের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ইরাকের বাগদাদ আদালতে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস)-এর সদস্যপদ গ্রহণের দায়ে সাত ফরাসি নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়ার পর ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়েছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তারা ইরাকের এ আইনি রায়কে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং ইরাকের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করছে।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক প্রতিনিধি এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি যে ফরাসি নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেসব সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, ইরাকের দণ্ডবিধি অনুযায়ী তাদের এ সাজা (যাবজ্জীবন ও ১৫ বছরের কারাদণ্ড) সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। ফ্রান্স সাধারণত অন্য কোনো স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য করে না এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপও করে না’।
কূটনৈতিক সূত্র থেকে ফ্রান্স সরকারের অবস্থান এবং তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর বিবরণ নিম্নরূপ : ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, বাগদাদে অনুষ্ঠিত এ বিচার প্রক্রিয়ার পুরো সময় জুড়েই ফরাসি দূতাবাসের প্রতিনিধিরা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ফরাসি সরকারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শুনানিতে আসামিদের তাদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ এবং নথিপত্র স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপে সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের ৩১ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, বন্দিরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগের পূর্ণ অধিকার পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ফরাসি আইনজীবীদেরও ইরাকি বার অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় ডিফেন্স দেয়ার সুযোগ ছিল। পাশাপাশি শুনানির পুরোটা সময় ফরাসি নাগরিকদের জন্য অনুবাদকের (দোভাষী) ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
ফ্রান্স যেহেতু বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ডের ঘোর বিরোধী, তাই তাদের নাগরিকদের এ যাত্রায় মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় ফরাসি নীতি নির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক স্বস্তি দেখা গেছে।
ফ্রান্সে ফেরত এনে তাদের সাজা খাটানো হবে কি না- সেই বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি প্যারিস। তবে ফরাসি দূতাবাস জানিয়েছে, সিরিয়া থেকে ইরাকে স্থানান্তরিত বাকি ফরাসি নাগরিকদের বিচারও আগামীতে অনুষ্ঠিত হবে এবং দূতাবাস কর্তৃপক্ষ প্রতিটি শুনানিতে নিবিড় নজরদারি বজায় রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দেশের উগ্রপন্থী নাগরিকদের ইউরোপে ফিরিয়ে নিয়ে বিচার করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি এড়াতে ফ্রান্স এক প্রকার আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইরাকের মাটিতে এ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দিচ্ছে। ইরাকের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানোর আড়ালে ফরাসি সরকার আসলে তাদের নাগরিকদের দায় সরাসরি এড়াতে চাইছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: আল মায়েদায় হামলা, প্রশ্নের মুখে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা হরমুজ প্রণালীতে
সূত্র : এপি, ইউরোনিউজ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন