০৭:৩১ পি.এম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তার নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ২৪০টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের জন্য মোদিকে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। যদিও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার গঠন করে এবং মোদি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
এই ফলাফল মোদির রাজনৈতিক প্রভাব, সরকারের কর্মসম্পাদন এবং ভোটারদের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করেছে। জনপ্রিয়তা হ্রাসের বিষয়টি বোঝার জন্য নির্বাচনী ফলের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, কৃষি, সামাজিক সম্প্রীতি, কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং বিরোধী রাজনীতির পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে।
জনপ্রিয়তা কমার পেছনে আলোচিত দশটি কারণ
আরও পড়ুন: কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয়, মার্কিন শেয়ারবাজারে চাঙা; কমল তেলের দাম
১. কর্মসংস্থানের সংকট ও শিক্ষিত বেকারত্ব
মোদির জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কর্মসংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ, প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা এবং বেসরকারি খাতে মানসম্মত কাজের অভাব তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডে–সিভোটারের জনমত জরিপে ২৭ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা বেকারত্বকে মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
২. দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না। খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। ২০২৬ সালের আগস্টের জনমত জরিপে ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্যও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি সামনে এনেছে।
আরও পড়ুন: স্মরণসভায় মির্জা আব্বাস / রাজপথের খাঁটি যোদ্ধা ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা
৩. তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান
মোদির রাজনীতির অন্যতম শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্মকে উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো। কিন্তু শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার মধ্যে প্রত্যাশিত সমন্বয় না ঘটলে সেই স্বপ্ন হতাশায় রূপ নিতে পারে। নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া তরুণদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত লে মঁদের এক প্রতিবেদনে ভারতের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সুযোগের ব্যবধান এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী মনোভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।
৪. কৃষক অসন্তোষ ও গ্রামীণ অর্থনীতির চাপ
ভারতের রাজনীতিতে কৃষকসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষিঋণ, উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশসহ কয়েকটি কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বিজেপির আসন কমার পেছনেও কৃষক অসন্তোষ, মূল্যস্ফীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির চাপকে বিশ্লেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র দুই বছরের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক তীব্র সংকটের মুখোমুখি
৫. অগ্নিবীর নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য চালু করা অগ্নিবীর প্রকল্প তরুণদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। সেনাবাহিনীতে স্থায়ী চাকরি, পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের প্রত্যাশা থাকা অনেক তরুণ নতুন ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত হিসেবে দেখছেন। ২০২২ সালে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী বিশ্লেষণেও অগ্নিবীর প্রকল্পকে বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
৬. জাতপাত, সংরক্ষণনীতি ও সংবিধান নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের নির্বাচনে জাতপাত ও সামাজিক সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীরা প্রচার করেছিল, বিজেপি ৪০০ আসন পেলে সংবিধান ও সংরক্ষণব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে। বিজেপি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর জনগণের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন নির্বাচনী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। উত্তরপ্রদেশে দলিত, অনগ্রসর শ্রেণি ও মুসলিম ভোটের বিরোধী জোটের দিকে সরে যাওয়াও বিজেপির আসন কমার একটি ব্যাখ্যা।
আরও পড়ুন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে জেন-জিদের উত্থান
৭. সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন
মোদির রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিজেপির নির্বাচনী প্রচারে হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের গুরুত্ব রয়েছে। এই রাজনীতি একাংশের কাছে সমর্থন তৈরি করলেও অন্য অংশের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ, সংখ্যালঘু অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছে, মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ২০২৫ সালের আগস্টের জনমত জরিপে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতিকে সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
৮. মণিপুর সংকট ও জাতিগত সহিংসতা মোকাবিলার প্রশ্ন
২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি জনগণের মধ্যে সংঘাত ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় সংকট তৈরি করে। দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, নারীর ওপর নির্যাতন এবং প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিরোধীরা সমালোচনা করেছে। এই সংকট উত্তর-পূর্ব ভারতের বাইরে জাতীয় পর্যায়েও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন: হত্যা মামলায় গ্রেফতার হলেন ইকবাল সোবহান, মুক্তি পেলেন রাজীব
৯. বিরোধী জোটের পুনরুত্থান ও বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া উল্লেখযোগ্য আসন অর্জন করে। কংগ্রেস এককভাবে ৯৯টি আসন পায় এবং সমাজবাদী পার্টিসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দল গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে। রাহুল গান্ধী বিরোধী রাজনীতিতে নতুন করে দৃশ্যমানতা তৈরি করেন। বেকারত্ব, সংবিধান, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মূল্যস্ফীতিকে সামনে রেখে বিরোধীরা বিজেপির প্রচারের বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
১০. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা, স্থানীয় অসন্তোষ ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
একই নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপরও এসে পড়ে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির ৩৭০ এবং এনডিএর ৪০০ আসন অতিক্রমের প্রচার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিজেপি এককভাবে ২৪০ আসন পায়। এর অর্থ, দলটি সরকার গঠনের মতো অবস্থানে থাকলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। স্থানীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং বিরোধীদের সংগঠিত প্রচার এই ফলাফলের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: হামের টিকা বিতরণে অনিয়মের তদন্তে কমিশন গঠন
জনপ্রিয়তা কি সত্যিই বড় মাত্রায় কমেছে?
নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে যাওয়া, মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ—এই তিনটি বিষয় এক নয়।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডে–সিভোটারের ‘মুড অব দ্য নেশন’ জরিপে মোদিকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেন ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা। জানুয়ারির জরিপে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ ছয় মাসে প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই জরিপে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের কর্মকাণ্ডকে ভালো বলেছেন ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা, যা জানুয়ারির তুলনায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট কম।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের অক্টোবরে ভারতের উত্তরপ্রদেশে সিএমআইইর জনমত জরিপে মোদির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কর্মকাণ্ডের প্রতি অনুমোদন ছিল ৪৬ দশমিক ১২ শতাংশ। এক বছর আগের তুলনায় সেখানে অনুমোদন কমেছে ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ পয়েন্ট। তবে এটি শুধু উত্তরপ্রদেশের পরিসংখ্যান, সমগ্র ভারতের নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন