১২:২৩ এম
বাংলাদেশ দূতাবাস, কাঠমান্ডু; রবিবার কাঠমান্ডুস্থ দূতাবাস-সংলগ্ন উৎসব কুঞ্জ (Utsav Kunja) ব্যাংকুয়েট হলে ‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’ শীর্ষক এক বিশেষ আম উৎসবের আয়োজন করা হয়। এ উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ আমের ঐতিহ্য, অনন্য গুণগত মান এবং বৈচিত্র্যময় স্বাদের পরিচয় তুলে ধরা হয় এবং তাজা ফল ও মূল্য সংযোজিত প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সার্ক সচিবালয়ের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার। বিশেষ অতিথি হিসাবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের যুগ্মসচিব জনাব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী নেপালের পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নেপাল সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক, গণমাধ্যমকর্মী, এবং অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান কৃষি ও কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আম কেবল একটি ফল নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি এবং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুঘল আমলের ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, উর্বর পলিমাটি ও অনুকূল জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের উৎকৃষ্টতম আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম। তিনি উল্লেখ করেন খিরসাপাত (হিমসাগর), হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, আশ্বিনা, বানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন, গৌরমতি এবং বারি আমসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের আম তাদের অতুলনীয় মিষ্টতা, অনন্য সুবাস, উচ্চমান এবং পুষ্টিগুণের জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
আরও পড়ুন: মাদারীপুরে কৃষককে কুপিয়ে জখম, প্রধান আসামি জাকির গ্রেফতার
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা মৌসুমের পরে দেরিতে ফলনশীল বিভিন্ন নতুন জাতের বারি আম উদ্ভাবন এবং বিদেশি কিছু জাতের সফল অভিযোজনের মাধ্যমে আম গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি দেশের বেসরকারি খাতের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আমের জুস, নেকটার, পাল্প, জ্যাম, আচার, চাটনি, শুকনো আম, ক্যান্ডি, ফ্রুট বার, ডেজার্টসহ নানা ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আমের ঐতিহ্য ও স্বাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সার্ক মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের আম ও আমজাত পণ্যের রপ্তানি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে অভিনন্দন জানান এবং কৃষি খাতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব জনাব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী বাংলাদেশ দূতাবাসকে এ ধরনের ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার পরিচয় বহন করে না; বরং দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের ‘ম্যাঙ্গো ডিপ্লোমেসি’ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব আরও জোরদারের লক্ষ্যে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের তাজা আমের পাশাপাশি আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত নানাবিধ পণ্যের একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ প্রদর্শন করা হয়। অতিথিরা বাংলাদেশের আমের স্বাদ, বৈচিত্র্য ও রন্ধনশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শনার্থীরা বাংলাদেশের আধুনিক উদ্যানতত্ত্ব, টেকসই কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে নতুন ধারণা লাভ করেন।
আরও পড়ুন: সারজিস আলম: গণহত্যাকারী হাসিনার অলীক ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসবে না
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সফল আমচাষি রফিকুল ইসলাম তার গত ১৫ বছরের আম চাষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (GAP) অনুসরণ করে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অতিথিদের সামনে উপস্থাপন করেন।
এই উৎসব শুধু বাংলাদেশের কৃষি সাফল্যের উদযাপনই নয়; বরং বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নেপালের ভোক্তাদের মধ্যে বাংলাদেশের আম ও আমজাত পণ্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই দেশের রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ সুগম করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপস্থিত অতিথিরা বাংলাদেশের আমের অসাধারণ স্বাদ, গুণগত মান ও বৈচিত্র্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্প্রসারণে তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে এবং আশা প্রকাশ করে, ‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’-এর মতো উদ্যোগ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।
উৎসবে বাংলাদেশের রাজশাহীর মৌসুমের পরে দেরিতে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের আম, যেমন—ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন, গৌরমতি, আশ্বিনা প্রভৃতি প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আমের জুস, আচার, ফ্রুট বার, শুকনো আম, চাটনি, জ্যাম ও জেলিসহ নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত আমপণ্যও প্রদর্শিত হয়। অতিথিদের জন্য আমের কেক, ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস, ম্যাঙ্গো পুডিংসহ বিভিন্ন ধরনের আমের ডেজার্ট পরিবেশন করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে আম চাষ, দেশের সংস্কৃতি, পর্যটন এবং Beautiful Bangladesh-এর ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
আরও পড়ুন: জিয়া সেদিন তাহেরের সাথে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে ফিরে আসতেন না: ব্রি. সাখাওয়াত
অনুষ্ঠানে ফল ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, চেম্বার নেতৃবৃন্দসহ প্রায় ২৫০ জন অতিথি ছাড়াও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে অতিথিদের জন্য ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন