প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান যুদ্ধে বেশ কিছু নৌপথ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যা জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা হরমুজের বিকল্প হয়ে উঠেছে। তবে সম্প্রতি রাশিয়ার ধারাবাহিক ড্রোন হামলা কৃষ্ণসাগরকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক নৌপথে পরিণত করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত এক ডজন বাণিজ্যিক জাহাজে রুশ ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য অবরুদ্ধ করা, কারণ এই বন্দরগুলো দিয়ে দেশটির উৎপাদিত প্রায় সব শস্য রপ্তানি হয়। বেশ কিছু হামলা ন্যাটোর দুই সদস্য রাষ্ট্র রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার খুব কাছাকাছি বা ভেতরে সংঘটিত হয়েছে। কৃষ্ণসাগর এবং এর পার্শ্ববর্তী আজভ সাগরে রাশিয়ার বন্দরগুলো ব্যবহার করা জাহাজগুলোর ওপর ইউক্রেনের কয়েক মাসব্যাপী হামলার পর রাশিয়া এই পালটা অভিযান শুরু করেছে।
নৌযান চলাচল এবং নিরাপত্তা বিষয়ক সূত্রগুলোর মতে, রাশিয়া একাধিক ঘটনায় সামুদ্রিক ও আকাশপথের ড্রোনকে একসঙ্গে যুক্ত করে যৌথ হামলা চালিয়েছে। তারা সম্প্রতি উদ্ভাবিত জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে, যা অধিক গতিসম্পন্ন এবং এগুলোকে রুখে দেওয়া বেশ কঠিন। এছাড়া তারা চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এমন ড্রোনও ব্যবহার করছে। নৌপথ ট্র্যাকিং পরিষেবা এবং রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলার এই আকস্মিক বৃদ্ধিতে অন্তত ৩০ জন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
গত সপ্তাহে একটি কনটেইনার জাহাজ রোমানিয়ার একটি বন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তিনটি ড্রোন সেটিতে আঘাত হানে। একটি ফরাসি নজরদারি বিমান ‘কনটশিপ জেট’ নামের ওই জাহাজটির দিকে একটি সামুদ্রিক ড্রোন ধেয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ করে এবং পরবর্তী ভিডিওতে জাহাজটিকে ডুবে যাওয়ার আগে একপাশে মারাত্মকভাবে হেলে পড়তে দেখা যায়। আঘাতের সময় জাহাজটি বুলগেরিয়ার উপকূল থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিলহা বলেছেন যে, হামলার এই ঊর্ধ্বগতি কৃষ্ণসাগরকে বেসামরিক নৌযান চলাচলের জন্য একটি বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত করছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউক্রেন সেপ্টেম্বরে ১.০৯ মিলিয়ন টন গম রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের ২.০৫ মিলিয়ন টনের তুলনায় অর্ধেক। ইউক্রেনীয়রা তাদের রপ্তানি কার্যক্রম রোমানিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা দানিউব নদীর ছোট ছোট বন্দরগুলোতে স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রাশিয়ার ড্রোন সেখানেও তাদের পিছু নিয়েছে।
হামলার এই তীব্রতা শুরু হয় অক্টোবরের শুরুর দিকে, যখন মিসর থেকে রোমানিয়ার সুলিনা বন্দরের দিকে যাওয়া তুর্কি মালিকানাধীন ‘আলফা ওয়াতান’ জাহাজটি আকাশ ও নৌ ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এতে সিরিয়ার ৯ জন এবং মিশরের ১ জন ক্রু সদস্য নিহত হন এবং জাহাজটি ডুবে যায়। এর ঠিক ছয় দিন পর, বুলগেরিয়ার উপকূলে রাতে ‘এইচএস ডিগনিটি’ জাহাজটি আক্রান্ত হলে সেটির ১১ জন ক্রু সদস্য নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন সিরিয়ার নাগরিক। সিরিয়ার নাবিকদের একজন অধিকারকর্মী মোহাম্মদ হাজ্জৌজ সিএনএন-কে বলেন যে, ডিগনিটি জাহাজে প্রথম আঘাতের পর ক্রু সদস্যরা একটি চালকবিহীন সামুদ্রিক যান এগিয়ে আসতে দেখেন, যা পরবর্তীতে জাহাজটিতে আছড়ে পড়ে। লাইফবোটগুলো পুরোপুরি চালু করতে না পেরে ক্রু সদস্যরা পানিতে ঝাঁপ দেন। হাজ্জৌজ বলেন, ‘তারা একে অপরকে ডাকতে শুরু করেছিল এবং একসাথে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সমুদ্র উত্তাল ছিল এবং পানি অত্যন্ত ঠান্ডা হওয়ায় ক্রু সদস্যরা একে অপরের থেকে দূরে ভেসে যান।’
হাজ্জৌজ বলেন, ’অর্থনৈতিক অনটন নাবিকদের বিপজ্জনক অঞ্চলে কাজ করতে বাধ্য করে। কখনো কখনো অতিরিক্ত বেতনের লোভ দেখিয়ে তাঁদের প্রলুব্ধ করা হয়। আবার অন্যদের কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে এসব এলাকায় কাজ করতে বাধ্য হতে হয়।’
রোমানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ানা-সিলভিয়া তোইউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবরের মধ্যে আরও চারটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যার মধ্যে রোমানিয়ার আঞ্চলিক জলসীমা এবং এর একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে ৮ জন প্রাণ হারান।
কৃষ্ণসাগর থেকে দানিউব নদীতে প্রবেশের পথ সুলিনা খালের কাছাকাছি দুটি কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার— 'ওয়াইন ট্রেডার' এবং 'ইয়ারা জে'; আঘাতের শিকার হওয়ার পর সেগুলোতে আগুন ধরে যায়। 'ওয়াইন ট্রেডার' জাহাজের অপারেটরের মতে, জাহাজটিতে তিনটি ড্রোন আঘাত হেনেছিল, যার ফলে বেনিনের ৬ জন এবং রাশিয়ার ১ জন নাগরিক নিহত হন।
শিপিং ইন্টেলিজেন্স ফার্ম অ্যামব্রের সামুদ্রিক বিশ্লেষকদের মতে, ’রুশ বাহিনী এখন ন্যাটোর দুই সদস্য রাষ্ট্রের ভেতরে ইউক্রেনীয় বাণিজ্যের সাথে যুক্ত জাহাজগুলোতে আঘাত হানছে।’ অ্যামব্রে আরও যোগ করেছে, ‘রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়ার জলসীমাকে এখন আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।’ তারা জানায় যে, বেশ কয়েকটি জাহাজকে খুব সম্ভবত ইউক্রেনীয় শস্য রপ্তানির সাথে সম্পৃক্ততার কারণেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
মস্কো অবশ্য সব হামলার কথা স্বীকার করেনি। তবে বেশ কয়েকটি ঘটনায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে লক্ষ্যবস্তু করা জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ’সামরিক এবং দ্বৈত-ব্যবহারের মালামাল’ বহন করছিল।
তবে রাশিয়ার এই হামলা নিয়ে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া ছিল খণ্ডিত। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, ’রাশিয়ার হামলা জোটের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ায় এই জোট ইতোমধ্যেই আমাদের পূর্ব প্রান্তে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে।’ রাশিয়ার সাথে তুলনামূলকভাবে ভালো সম্পর্ক থাকা বুলগেরিয়ার সরকার মস্কোকে দোষারোপ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে এখন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়া উভয়ই তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দিমিতার স্টয়ানোভের মতে, বুলগেরিয়া তার প্রতিরক্ষা বাড়াতে যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থা মোতায়েনের জন্য ন্যাটোর কাছে অনুরোধ করেছে। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে বুলগেরিয়া ন্যাটোর একটি ড্রোন-বিরোধী উদ্যোগে যোগ দেবে।
রোমানীয়রা উপকূলজুড়ে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের টহল মোতায়েন করা শুরু করেছে। এর মধ্যে একটি যুদ্ধবিমান অক্টোবরের শেষের দিকে রোমানিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার ওপর রাশিয়ার সর্বশেষ প্রজন্মের দুটি ড্রোন গুলি করে নামায়। রোমানিয়া এও বলেছে যে তারা কৃষ্ণসাগরে মাইন এবং ড্রোন মোকাবিলা করার জন্য নজরদারি সক্ষমতা এবং যন্ত্রপাতির বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো জাহাজ কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ইউক্রেনীয় বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী জাহাজের সংখ্যা তীব্রভাবে কমে গেছে, অন্যদিকে বীমার হার আকাশচুম্বী হয়েছে।
লন্ডনের বীমা বাজারের ঝুঁকি মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট ওয়ার কমিটি গত মাসে ’উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত অঞ্চলের পরিধি বাড়িয়ে সমগ্র কৃষ্ণসাগর অঞ্চলকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এতে তুরস্ক, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং জর্জিয়ার আঞ্চলিক জলসীমাকে বাদ রাখা হয়েছে।
উচ্চ বীমা প্রিমিয়াম ইউক্রেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষি রপ্তানির জন্য একটি খারাপ খবর, যার ৯০ ভাগ এই নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইউক্রেন বিশ্বব্যাপী ভুট্টা রপ্তানির প্রায় ১৫ ভাগ এবং গমের ১০ ভাগ সরবরাহ করে এবং দেশটি সূর্যমুখী তেলের বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল কৃষ্ণসাগরকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা এবং এর সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের জীবনরেখাকে নিজেদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন