১০:১৫ এম
চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নিয়ে। এই সফরটি সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা এ সফরের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্ক ইতোমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নসহ নানা বড় প্রকল্পে চীনা অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোতে গতি এনেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশে একটি অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রধান আমদানিকারক দেশ হিসেবেও পরিচিত। যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কাঁচামাল এবং টেক্সটাইল ইনপুটের বড় অংশই চীন থেকে আসে।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল (রোববার) মালয়েশিয়ায় দু'দিনের সফরে গেছেন। এটি তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। মালয়েশিয়া সফর শেষ করে আজ (সোমবার) রাতে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বন্দনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।
আরও পড়ুন: মিয়ানমারে পাচারকালে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া ও ৮ পাচারকারী আটক
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত শনিবার গণমাধ্যমে জানান, সফরের সময় চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। সেই বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেছেন, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবার বিষয়।
আসাদ আলম জানান, সফরের সময়ে বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা এবং প্রটোকল স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরের শুরুতে দালিয়ানে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। সেখানে তিনি 'ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ' শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদান করবেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এক্সিম ব্যাংকসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় শ্রম আন্দোলনের নামে হামলায় শ্রমিক মো. সেলিম গুরুতর আহত
আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ প্রধান অতিথি হিসেবে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে এই বাণিজ্যের কাঠামো মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি অংশ তুলনামূলকভাবে কম।
তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও জিডিআই এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিভিত্তিক কাঠামো নয়, এটা মূলত একটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: শুক্রবার চট্টগ্রামে যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মহাসম্মেলনে বক্তব্য দেবেন
ব্যবসায়ীদের মতে, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতায় যথেষ্ট পরিবর্তন আসতে পারে।
তারা দেখছেন, চীনের বিনিয়োগ যদি অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পেও সম্প্রসারিত হয়, তাহলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বাসসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন একটি মাত্রা প্রদান করতে পারে।
তাঁর মতে, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কৃষিখাতে আগ্রহ দেখালেও সেই কাক্সিক্ষত মাত্রার বিনিয়োগ এখনো আসেনি।
আরও পড়ুন: ‘ইউ ক্যান ডু ইট’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, ১৬ লাখ শিশু-কিশোরের নিবন্ধন
মোহা. খোরশেদ আলম আরও বলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার এবং বিনিয়োগ সক্ষমতা বাংলাদেশে কাজে লাগানো গেলে পুঁজিবাজার আরও গভীর এবং স্থিতিশীল হতে পারে। একই সাথে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ালে উৎপাদন সক্ষমতা বহু গুণ বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ টানার জন্য নিশ্চিত নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকতা বজায় না রাখা হয়, তবে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, এতে মার্কিন ডলার নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেন ব্যয় হ্রাস ঘটবে।
চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি সিসিইসিসির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু বাসসকে জানান, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তিনি মনে করেন, এই উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
আরও পড়ুন: আ.লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য চেয়েছে সংসদীয় কমিটি
তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ চীনা ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেবেন।
ব্যবসায়ীদের মতামত, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি তিনটি মূল বিষয়ের উপর নির্ভর করবেÑবিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন