প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মোংলা উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ চাষে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
চৈত্র-বৈশাখে টানা অনাবৃষ্টির কারণে, তীব্র তাপদাহ ও ঘেরের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ছড়িয়ে পড়ায় মাছে ক্ষত দেখা দিচ্ছে।
প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বাগদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মারা ভেসে উঠছে।
আর এনজিও কিংবা ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে প্রায় ১৪ হাজার চাষি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, অপরিকল্পিত চাষের কারণে প্রতিবছর এমন ঘটনা ঘটে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভৌগলিক কারণে মোংলা উপজেলার মাটি ও পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত।
ফলে এখানে ধान কিংবা অন্য কোনো কৃষিজ ফসল বুনতে পারে না।
জীবনের তাগিদে এই উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা হচ্ছে মৎস্য চাষ।
স্থানীয় মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মোংলা উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ১৩ হাজার ৭৬৮ চাষি বোদ্ধা, গলদা ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ চাষ করে।
এর মধ্যে বাগদা চাষি ৬ হাজার ৭০ জন, গলদা চাষি এক হাজার ৮৫০ জন, সরকারি ক্লাস্টার চাষি ১০০ জন এবং ছোট পুকুর ও সাদা মাছ চাষির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৪৮ জন।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ঘেরের পানির গভীরতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
দুপুরের তীব্র রোদে ঘেরের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী মৎস্য চাষিরা জানিয়েছেন, ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা ঘেরে পোনা ছেড়েছিলেন।
কিন্তু অনাবৃষ্টি এবং গরমে পানি শুকিয়ে মাছ লাল হয়ে মারা ভেসে উঠছে।
ধারদেনা শোধ ও পরিবারের ভরণপোষণ চালানো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এই উপজেলায় পাঁচ হাজার ৬২১ মেট্রিক টন বাগদা ও গলদা এবং সাত হাজার ৮৮৫ মেট্রিক টন সাদা মাছ উৎপাদন হয়েছিল।
তবে তীব্র তাপদাহের কারণে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে চলতি অর্থ বছরে মোংলায় মাছের সামগ্রিক উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ কমে যেতে পারে।
যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস ডেকে আনবে।
এই চরম বিপর্যয় থেকে উপকূলের প্রধান অর্থনৈতিক খাতটিকে রক্ষা করতে এবং দেনার দায়ে জর্জরিত প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মোংলায় চিংড়ি ঘের মালিকরা বলছেন, 'আমরা একবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি।'
এইবারের মতো এত গরম আর কোনো বছর দেখিনি।
চৈত্র-বৈশাখ পার হয়ে গেল, কিন্তু গরম কমার কোনো লক্ষণ নেই।
ঘেরের পানি রোদের তাপে পুরোপুরি ফুটন্ত গরম পানির মতো হয়ে যাচ্ছে।
ঘেরে নদীর পানি ঠিকমতো তুলতে পারিনি, তাছাড়া পানির গভীরতা কম হওয়ায় রোদ সরাসরি তলানিতে গিয়ে লাগছে।
তারা আরও জানালেন, গত কয়েকদিন ধরে দুপুরের পর ঘেরের পানি বিষিয়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন সকালে এসে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার বাগদা এবং গলদা চিংড়ি মারা পানির উপরে ভেসে উঠছে।
ধার-দেনা ও ব্যাংক লোন নিয়ে আমরা এইবার ঘেরে পোনা ছাড়ছিলাম, আশা ছিল মাছ বেঁচে আগের সব ঋণ শোধ করব।
কিন্তু সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তাপদাহ, পানিতে লবণ ও ভাইরাসের আক্রমণ—সব মিলিয়ে মাছের এই মড়ক ঠেকানোর কোনো উপায় পাচ্ছি না।
পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব, তা ভাবতে গিয়ে রাতে ঘুম আসে না।
সরকারি কোনো বড় সহায়তা বা প্রণোদনা পেলে আমাদের মতো ছোট ঘের মালিকদের না খেয়ে রাস্তায় বসার ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা তথা উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
কিন্তু এখানকার অধিকাংশ চাষি এখনও সনাতন ও অপরিকল্পিত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছেন।
অনেকেই ঘেরে কোনো ধরনের সম্পূরক খাবার না দিয়ে কেবল প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভর করে মাছ ছেড়ে রাখেন।
খাবারবিহীন এই চাষ পদ্ধতি চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম কমাতে পারে।
যার ফলে জলবায়ুর সামান্য পরিবর্তনেও ঘেরে মড়ক দেখা দেয়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, আমরা চাষিদের বারবার অনুরোধ করছি—আপনারা এই সনাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি পরিহার করুন।
ঘেরের গভীরতা কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ ফুট করুন, সঠিক নিয়মে সুষম ও মানসম্মত মৎস্য খাদ্য প্রয়োগ করুন।
পোনা ছাড়ার আগে অবশ্যই পিসিআর ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসমুক্ত পোনা নিশ্চিত করতে পারলে ঘেরে মাছ চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, 'আমরা নিয়মিত চাষিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চাষের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।'
চাষিরা সচেতন না হলে এবং অপরিকল্পিত চাষ বন্ধ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।
আমাদের মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে ঘেরের আয়তন বিশাল করা হলেও, সেগুলোর পানির গভীরতা মাত্র এক থেকে ১.৫ ফুট।
তীব্র তাপদাহে এই অল্প পানি দ্রুত ফুটন্ত গরম হয়ে যায় এবং অক্সিজেন সংকটে মাছ মারা যায়।
অনেক চাষি বেশি লাভের আশায় শতাংশ প্রতি নির্ধারিত ঘনত্বের চেয়ে অতিরিক্ত পোনা ছাড়েন, যা এই বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
চলতি অর্থ বছরে মোংলায় ১৩ হাজার ৭৬৮ জন মৎস্য চাষির মধ্যে মাত্র ৬০ জনকে সরকারিভাবে মাছ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন