প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পলাশীর যুদ্ধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা বাংলা ভূখণ্ডের সংস্কৃতি ও সমাজে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঔপনিবেশিক ক্ষতের সূচনা করেছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের এই ঘটনাটি শুধু একটি কোম্পানির জয় বা নবাবের পতন ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার বহুত্ববাদী সমাজকাঠামোকে চিরতরে পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে একটি ঔপনিবেশিক সূচনা। পলাশীর যুদ্ধ কেবল সামরিক পরাজয়ের পরিচয় দেয়, বরং এটি আমাদের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের সাক্ষী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে শনিবার (২৭ জুন) অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সেমিনারে বক্তারা এই বিষয়ে আলোচনা করেন। ‘সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ’ (সিবিএস)-এর আয়োজনে ‘পলাশী উত্তর বাংলা: ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভাজনের রাজনীতির বিকাশ’ শীর্ষক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে অংশ নেন দেশের বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক, চিন্তক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
সেমিনারের শুরুতে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এরপর মূল প্রবন্ধ শোনার পর আলোচনার পর্বে তিনজন গবেষক পলাশী-পরবর্তী বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
আলোচনার প্রথম পর্বে, ইতিহাস গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন সমসাময়িক ফার্সি ভাষার গ্রন্থের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি তুলে ধরেন যে, বিজিত নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ‘খলনায়ক’ বানিয়ে ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনের ফলে ব্রিটিশরা তাদের শাসনের বৈধতা সৃষ্টি করেছিল। লর্ড ক্লাইভ, জগত শেঠ, রায় দুর্লভ ও উমিচাঁদদের আঁতাত কেবল ব্যক্তিস্বার্থের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, বরং তা ছিল উদীয়মান বণিক পুঁজির ও ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক শক্তির মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক বোঝাপড়া।
দ্বিতীয় বক্তা জান্নাতে গুলশান তার আলোচনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় স্থান মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে স্থানান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এর সামাজিক-রাজনৈতিক অভিঘাত তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো ভূমি ও অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে এক পক্ষকে পৃষ্ঠপোষকতা ও অন্য পক্ষকে প্রান্তিকীকরণের সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ধীরে ধীরে গভীর রাজনৈতিক অবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়।
গবেষক ইমরুল হাসান দেখান কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসকরা শিক্ষা, ভাষা ও চিন্তার ওপর একমাত্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, যা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীন এবং পশ্চিমা সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে প্রভাবিত করে। তিনি বর্তমানের শিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে এই বিষয়গুলোর সংযোগ তুলে ধরে বলেন, এই ক্ষমতার পালাবদল শতকের পর শতক ধরে বিদ্যমান সামাজিক বন্ধনগুলোকে ভেঙেছে এবং হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেছে, যার একটি নির্মম পরিণতি ঘটে ১৯৪৭ সালের দেশভাগে।
সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আজকের এই সেমিনার পলাশী ট্র্যাজেডির সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং সমকালীন মনস্তত্ত্বে এর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত ও পেছনের রাজনীতিকে নতুনভাবে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করবে। আলোচনার শেষে এক প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দর্শক ও গবেষকদের মাঝে সমকালীন রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে ইতিহাসের এই জটিল সমীকরণের সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন