প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিজ্ঞানীরা চাঁদে একটি বিশাল গর্তের সন্ধান পেয়েছেন। এই গর্তের আকার রোমান কলোসিয়ামের থেকেও বড়। প্রায় দুই বছর আগে একটি শক্তিশালী মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতের ফলে গর্তটি সৃষ্টি হয়, তবে তখন এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। গর্তটির ব্যাস প্রায় ৭২৮ ফুট বা ২২২ মিটার এবং গভীরতা সর্বাধিক ১৪১ ফুট বা ৪৩ মিটার। এর চারপাশের দেয়ালও বেশ খাড়া।
গবেষকদের মতে, এটি সৌরজগতে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় আঘাতজনিত গর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের বড় আঘাতের ঘটনা গড়ে প্রতি ১৩২ বছরে একবার ঘটে। তাই এই গর্তটি চাঁদের পৃষ্ঠ এবং মহাজাগতিক আঘাত সম্পর্কে গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে, নাসা যখন ভবিষ্যতে চাঁদে নভোচারীদের জন্য একটি ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে, তখন এই আবিষ্কার সেই পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বুধবার সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিরল বলে উল্লেখ করেছেন। নাসার লুনার রিকনেসেন্স অরবিটার (এলআরও) ২০২৪ সালের মে মাসে চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশে গর্তটি শনাক্ত করে। ধারণা করা হচ্ছে, এর কিছুদিন আগে একটি গ্রহাণু বা ধূমকেতুর ভেঙে যাওয়া অংশ চাঁদে আঘাত করলে গর্তটি তৈরি হয়।
আঘাতের সময় পৃথিবী বা মহাকাশে থাকা টেলিস্কোপগুলো ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারেনি। বিপুল পরিমাণ তথ্যের কারণে ২০২৫ সালের আগস্টের আগে এলআরও-এর তোলা বিস্তৃত-কোণের ছবিতেও গর্তটি ধরা পড়েনি। পরে মহাকাশযানটি আরও বিস্তারিত ছবি সংগ্রহ করে এবং চলতি বছরের শুরুতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারটি নিশ্চিত করেন।
গহ্বরটির নাম রাখা হয়েছে হিউস্টনের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ইনস্টিটিউটের প্রয়াত সাবেক পরিচালক টমাস ম্যাকগেচিনের নামে। এটি প্রায় এক দশক আগে এলআরও-এর আবিষ্কার করা আগের রেকর্ডধারী গর্তটির চেয়ে তিন গুণ বড়। চাঁদের পৃষ্ঠে প্রাচীনকাল থেকেই অসংখ্য গর্ত রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই গ্রহাণু, ধূমকেতু বা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে তৈরি হয়েছে। চাঁদে সৌরজগতের সবচেয়ে বড় কয়েকটি আঘাতজনিত গর্তও বিদ্যমান। এর মধ্যে একটি গর্তের বিস্তৃতি এক হাজার ৫০০ মাইল বা প্রায় দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি।
নতুন গর্তটি তৈরির সময় চাঁদের ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে মাটি ও পাথরের স্তর ওলটপালট হয়ে যায়। ইনটুইটিভ মেশিনসের গবেষক এবং এলআরও-এর ক্যামেরা দলের প্রধান বিজ্ঞানী মার্ক রবিনসন জানান, চাঁদের ধুলো ও পাথুরে মাটি বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি খাড়া কোণে চারদিকে ছিটকে পড়েছিল।
এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের প্রধান লেখকও তিনি। অন্য একটি গবেষণায় নতুন গর্তটির চারপাশে প্রায় ৭ কিলোমিটার চওড়া একটি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা অঞ্চল শনাক্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের উপরিভাগের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চল তৈরি হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক এবং গবেষণাটির সহলেখক ডেভিড পেইজ এই প্রক্রিয়াকে বাগানের মাটি চাষ বা খুঁড়ে ওলটপালট করার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এক বিবৃতিতে পেইজ বলেন, মহাজাগতিক বস্তুর আঘাত চাঁদের উপরিভাগের মাটি বা ‘রেগোলিথ’ নাড়িয়ে দেয়। এতে মাটির স্তর ওলটপালট হয় এবং সাধারণত মাটির নিচে থাকা উপাদানগুলোও উপরে উঠে আসে।
২০০৯ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে এলআরও চাঁদে অসংখ্য গর্ত আবিষ্কার করেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে ছিটকে পড়া পদার্থের কারণে চাঁদের উপরিভাগের প্রায় ২ সেন্টিমিটার বা ১ ইঞ্চি গভীর মাটি প্রতি ৮০ হাজার বছরে একবার ওলটপালট হয়ে যায়। আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এই পরিবর্তন ঘটতে আরো বেশি সময় লাগে। নতুন তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, চাঁদের উপরিভাগের মাটি আগের ধারণার তুলনায় দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
অনেকে মনে করেন, অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীদের চাঁদের মাটিতে রেখে যাওয়া ধুলোমাখা পায়ের ছাপ হয়তো চিরকাল টিকে থাকবে। তবে মার্ক রবিনসনের মতে, তা হবে না। তিনি এক ইমেইলে জানান, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এসব পায়ের ছাপ নিশ্চিতভাবেই আর টিকে থাকবে না।
এখন গবেষকদের পরবর্তী কাজ হলো, চাঁদের বিভিন্ন গর্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা মাটি ও পাথরের টুকরো ভবিষ্যতে নাসার পরিকল্পিত চন্দ্রঘাঁটিতে আঘাত হানার ঝুঁকি কতটা, তা নির্ণয় করা। রবিনসনের মতে, এই তথ্য প্রকৌশলীদের চন্দ্রঘাঁটির কাঠামো আরো নিরাপদভাবে নকশা করতে সাহায্য করবে। ফলে মহাজাগতিক আঘাতে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন