প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে মানুষের যাতায়াত ব্যয় নতুন করে বাড়ছে। দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাজধানীতে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সরকারি নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ৩০-৪০ টাকার ভাড়া ৫০-৬০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও দূরপাল্লার বাসে একেক যাত্রীর কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এটি শুধু যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে নয়, পণ্য পরিবহণেও খরচ বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর ও আঞ্চলিক বাজারে ট্রাকভাড়া ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। কোথাও ৫ হাজার টাকার ট্রাকভাড়া ৭ হাজার টাকা হয়েছে। আবার ১৮-২০ হাজার টাকার ভাড়া বেড়ে ২৪-২৫ হাজার টাকা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, পরিবহণ খরচের এই বাড়তি টাকা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এখন শুধু পাম্পে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা গোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তেলের দাম থেকে শুরু করে বাসভাড়া, ট্রাকভাড়া, পণ্য পরিবহণ এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পণ্যের দামের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
নতুন ভাড়া নির্ধারণের পরেও বাড়তি আদায় থামেনি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) পরিবহণ মালিকদের সঙ্গে সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর দূরপাল্লা ও মহানগরের বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই দিন বিআরটিএর ওয়েবসাইটে বিভিন্ন রুটের নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বেড়েছে। দূরপাল্লার পথে বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। তবে স্থানভেদে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ ও ১০ টাকা বহাল রাখা হয়েছে।
কাগজে-কলমে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই অনেক রুটে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকেরা বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করেছেন। ময়মনসিংহে ৩০-৪০ টাকার স্থানীয় বাসভাড়া ৫০-৬০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। জামালপুর থেকে ঢাকাগামী বাসে জনপ্রতি ৪০-৫০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ঢাকাগামী বাসের ভাড়া বেড়েছে ১০০ টাকা। উপজেলা সদর থেকে জেলা শহরের মাত্র ২০ কিলোমিটার পথেও যাত্রীদের ১০-২০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
বরিশালের বিভিন্ন রুটেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক রাতের ব্যবধানে কোনো কোনো রুটে ৩০ টাকার বাসভাড়া ৪০ টাকা হয়ে গেছে। কুমিল্লা থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার নন-এসি বাসের ভাড়া ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা এবং চট্টগ্রামের ভাড়া ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা হয়েছে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট পরিবহণ ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকার ট্রাকভাড়া আগে ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। জ্বালানির দাম বাড়ার পর সেই ভাড়া বেড়ে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ একেকটি ট্রাকে বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ব্যয়বহুল। আগে যেখানে ট্রাকভাড়া ছিল ২৮ থেকে ২৯ হাজার টাকা, এখন দিতে হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ট্রাকে বাড়তি খরচ প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।
খুলনা থেকে বাগেরহাটে আলু পরিবহণেও ভাড়া ৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার টাকা হয়েছে। ময়মনসিংহে রংপুর থেকে ১৫ টন আলু আনতে পরিবহণ খরচ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলছেন, এই বাড়তি ব্যয় তারা কীভাবে সামলাবেন? তাদের স্বাভাবিক হিসাব বলছে, পরিবহণ খরচ বাড়লে পণ্যের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সেই খরচ যুক্ত হয়। ফলে তেলের দাম বাড়ানোর কয়েক ধাপ পর তার প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তার বাজারে।
বাজারে চাপের চক্র
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাস ও ট্রাকের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। ট্রাকভাড়া বাড়লে পণ্য পরিবহণ ব্যয়ও বাড়ে। পরিবহণ ব্যয় বাড়লে পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। পাইকারি দাম বাড়লে খুচরাবিক্রেতারাও দাম সমন্বয় করেন। শেষ পর্যন্ত বাড়তি খরচ ভোক্তাদের বহন করতে হয়। এই চক্রের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। কারণ তাদের আয় তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ছে না। কিন্তু বাসভাড়া, বাজার খরচ এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যয় একসঙ্গে বাড়ছে।
বাগেরহাটের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিন মোটরসাইকেলে খুলনা-বাগেরহাট যাতায়াত করতেন। চার লিটার তেলের জন্য প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হওয়ায় তিনি মোটরসাইকেল বাদ দিয়ে লোকাল বাসে যাতায়াত শুরু করেছেন। ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের মার্কেটিং প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অকটেনের দাম ১২৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হলেও তার দৈনিক যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকাই রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ তাকে নিজের আয় থেকেই বহন করতে হচ্ছে।
এ ধরনের কর্মীদের ক্ষেত্রে হিসাবটি সরল। জ্বালানির দাম বাড়ানোর অর্থ হলো কাজ করতে যাওয়ার খরচ বাড়া। আর আয় একই থাকলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে কমাতে হবে অন্য কোনো খরচ।
নিত্যপণ্যের বাজারে দ্বিতীয় ধাক্কা
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রাথমিক ধাক্কা পরিবহণে পড়ে। দ্বিতীয় ধাক্কা আসে বাজারে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, চাল, ডাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ট্রাক ও পণ্যবাহী যান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহণ ব্যয় বাড়লে শুধু ট্রাক মালিকের খরচ বাড়ে না, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার খরচও বাড়ে। পণ্য আড়তে পৌঁছানো, সেখান থেকে পাইকারি বাজার এবং পরে খুচরা বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিবহণের প্রয়োজন হয়।
বাগেরহাটে এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, খুলনা থেকে ট্রাকে আলু আনতে আগে ৫ হাজার টাকা লাগলেও এখন ৭ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এই বাড়তি দুই হাজার টাকা ব্যবসায়ীকে কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করতে হবে। এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মাগুরায় পরিবহণ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পণ্য ঢাকায় পাঠাচ্ছেন না বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে একদিকে সরবরাহ কমার ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
কৃষকের ঘাড়েও বাড়ছে খরচ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষকের ক্ষেতেও সরাসরি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচ, কৃষিযন্ত্র, জমি প্রস্তুত, ফসল পরিবহণসহ কৃষির বিভিন্ন ধাপে জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। গোপালগঞ্জের এক কৃষক জানিয়েছেন, আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষককে হয় পণ্যের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ নিজের লাভ থেকে বহন করতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই এর প্রভাব বাজারে পড়তে পারে। কৃষক বেশি দাম চাইলে ভোক্তার খরচ বাড়বে। আবার দাম বাড়াতে না পারলে কৃষকের লাভ কমবে।
যাত্রী-মালিক উভয়েই চাপে
পরিবহণ মালিকদের বক্তব্যও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জ্বালানির দাম বাড়লে বাস পরিচালনার দৈনিক ব্যয় সত্যিই বাড়ে। গাইবান্ধার পরিবহণ শ্রমিক নেতারাও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাস মালিকদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন জড়িত। জ্বালানির বাড়তি খরচের কতটা ভাড়ার মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে এবং কতটা যাত্রীদের ওপর চাপানো হবে, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নতুন ভাড়া নির্ধারণের উদ্দেশ্যই হলো এই সমন্বয়কে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত আদায় চলতে থাকে, তাহলে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেও যাত্রী হয়রানি বন্ধ করা যাবে না।
নজরদারিই এখন বড় পরীক্ষা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন ভাড়া বাস্তবায়ন ও নজরদারির ওপর। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে স্থানীয় রুটে ভাড়ার তালিকা যাত্রীদের কাছে কতটা সহজলভ্য, পরিবহণ মালিকেরা তা মানছেন কি না এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
একইভাবে পণ্য পরিবহণে ট্রাকভাড়া বাড়ার বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাতে যদি পরিবহণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এখন একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিচ্ছে। পাম্পে বাড়তি দাম দেওয়ার পর দ্বিতীয় ধাক্কা আসছে বাসভাড়ায়, তৃতীয় ধাক্কা পণ্য পরিবহণে এবং শেষ ধাক্কাটি গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে।
তাহলে শুধু নতুন ভাড়া নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হচ্ছে কি না, পরিবহণ মালিকেরা অতিরিক্ত আদায় করছেন কি না, পণ্য পরিবহণের খরচ কতটা যৌক্তিকভাবে বাড়ছে এবং সেই অজুহাতে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, এসব বিষয় একই সঙ্গে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
কারণ তেলের দাম বাড়ার প্রভাব কতদূর যাবে, সেটি শুধু জ্বালানি খাতের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের যাতায়াত, কৃষকের উৎপাদন, ব্যবসায়ীর পরিবহণ ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সংসারের হিসাব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন