প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় আইন ও নীতিগত অগ্রগতি ঘটলেও, সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এখনও একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানি, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিক হিসেবে মর্যাদার অভাব এখনো বহু গৃহকর্মীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। তাই আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; পরিবার, নিয়োগকর্তা এবং সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন না এলে গৃহকর্মীদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন। কানাডা সরকারের সহায়তায় ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত ‘সুনীতি’ প্রকল্পের সাত বছরের অর্জন, শিক্ষা, নীতিগত অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় আলোচনা করার জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির বলেন, গৃহকর্মীসহ কোনো খাতের শ্রমিকদের অধিকার সরকারের একার পক্ষে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ঘরে গিয়ে শিশু শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা সরকারের একার পক্ষে মনিটর করাও সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং অধিকার সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এখনো গৃহকর্মীদের বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের আলোকে শ্রম বিধিমালা হালনাগাদের কাজও অনেক দূর এগিয়েছে, যা চলতি বছরের মধ্যেই একটি রূপ পাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, সবকিছু পরিবর্তন করলাম, কিন্তু মানসিকতা পরিবর্তন না করলে হবে না। তিনি প্রশ্ন করেন, "আমার গৃহকর্মীকে আমি কেন আমার সহকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারি না?" কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মস্থল ও আবাসিক ভবনে দিবাযত্ন কেন্দ্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি গৃহকর্মীদের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ২০২৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও তা এখনো আংশিক। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সুনীতি’ প্রকল্পের বড় অর্জন হলো গৃহকর্মীদের সংগঠিত করা এবং তাদের নিজস্ব নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা।
তিনি বলেন, নারী গৃহকর্মীদের কোনো কিছুই পূর্ণভাবে আমরা পাইনি। ২০২৬ সালে আমরা যে আইনটি পেয়েছি, সেটিও আংশিক স্বীকৃতি। দীর্ঘ একটি যাত্রা আমরা অতিক্রম করে এসেছি, সামনেও একটি দীর্ঘযাত্রা রয়ে গেছে।
কানাডা সরকারের অ্যাক্টিং হেড অব করপোরেশন জেন পালমার বলেন, ‘সুনীতি’ প্রকল্প গৃহকর্মীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সমষ্টিগতভাবে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নিরান রামজুথান বলেন, গৃহকর্মীদের অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক অবস্থান থেকে আইনি সুরক্ষার কাঠামোয় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, গৃহকর্মীদের নিয়ে সমাজের প্রচলিত মানসিকতায় এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। একইসঙ্গে শিশুরা যেন ভবিষ্যতে গৃহকর্মে না আসে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের ইন্টেরিম কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে গৃহকর্মীদের জাতীয় ফোরামের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বক্তব্য দেন। প্রকল্পের যাত্রা, অর্জন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বাংলাদেশে অক্সফ্যামের কর্মসূচি পরিচালক মাহমুদা সুলতানা।
অনুষ্ঠানে ‘সুনীতি’ প্রকল্পের সাত বছরের অভিজ্ঞতা, তথ্য-প্রমাণ, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গৃহকর্মীদের জীবনের ১০টি গল্প নিয়ে প্রস্তুত প্রধান প্রকাশনার আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পরবর্তী অধিবেশনে প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ফলাফল ও শিক্ষা উপস্থাপন করেন অক্সফ্যাম কানাডার পুষ্পিতা সাহা। অধিবেশন সঞ্চালনা করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের তারেক আজিজ।
মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানানো হয়, গৃহকর্মীদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ২০১৯ সালে ১২ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির সক্ষমতা ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ শতাংশ এবং লিখিত চুক্তির হার ৮ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ গৃহকর্মী জানিয়েছেন, তারা আগের তুলনায় বেশি মজুরি পাচ্ছেন। তাদের মাসিক আয় গড়ে ৮৫০ টাকা বেড়েছে বলেও মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন