প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। এজন্য তারা আগামী কয়েক দশকে বিপুল অংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন ভাবছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যকে ২৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হতে পারে এই লক্ষ্য পূরণে। এই তথ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে যুক্ত উৎপাদন, প্রযুক্তি, গবেষণা, সফটওয়্যার অবকাঠামো ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিকল্প সৃষ্টি করতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ইউরোজোনের জন্য প্রয়োজন ৯.১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্যের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার।
ইওয়াই-পার্থেননের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আগামী ২৫ বছরে তিন অঞ্চলের গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৯৪০ বিলিয়ন ডলার বা ৯৪ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এটি জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে চলমান বিনিয়োগের উপরে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। তুলনা হিসেবে বলা হয়, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। এইদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অতিরিক্ত ব্যয় প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ বর্তমানে চলমান বার্ষিক বাজেটের প্রায় দ্বিগুণের সমান।
ইওয়াই-পার্থেননের কর্মকর্তা ও যুক্তরাজ্যের সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ম্যাটস পারসনের ভাষ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল স্থানীয়করণ করা সহজ হবে না। কারণ এতে করদাতা ও ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপশি আংশিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোই একটি বাস্তবসম্মত পথ হবে। প্রথমে ব্যয় তুলনামূলক কম থাকবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু অর্থ ব্যয় করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উন্নত উৎপাদন, বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন, ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহে এখনও চীনের আধিপত্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের পরিশোধিত লিথিয়াম ও কোবাল্টের ৬০ শতাংশের বেশি এবং ব্যাটারি-গ্রেড গ্রাফাইট ও বিরল খনিজের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করবে চীন। ফলে এসব কাঁচামালের বিকল্প উৎস তৈরি করা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য জটিল হয়ে দাঁড়াবে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকির ফলে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গাড়ি শিল্পে উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। যদিও পরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল, তবুও বিষয়টি পশ্চিমা দেশগুলোকে সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিরল খনিজ মজুদ নিয়ে পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ফরাসি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, ‘বড় অংকের বিনিয়োগ করলেও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে দ্রুত চীন থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। কারণ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপাদানের নিয়ন্ত্রণ এখনও চীনের হাতে রয়েছেন।’
ইওয়াই-পার্থেননের হিসাব অনুযায়ী, চীনে উৎপাদিত অনেক পণ্যের কারখানা পর্যায়ের খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় ২০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত কম। সুতরাং, চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। এর ফলে ভোক্তা মূল্যেও প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে পণ্যের দাম ১ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এতে মূল্যস্ফীতি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য বিরোধ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা পশ্চিমা দেশগুলোকে নতুন শিল্পনীতি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। তবে চীনের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়তে সময়, বিপুল অর্থ, এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন