প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
১৯৭৯ সালের শেষের দিকে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটে। সেই ঐতিহাসিক পটভূমিতে অনেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, নতুন এই মতাদর্শিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও জাতীয় গৌরব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে, রাষ্ট্র গঠনের তাড়না এবং প্রতিষ্ঠার মাত্র দশ মাসের মাথায় সাদ্দাম হোসেনের ইরাক কর্তৃক ইরান আক্রমণের ফলে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয়। এই আবহে সিরাজ শহরের শাহ চেরাগ নামে পরিচিত স্থান থেকে উঠে আসা আহমদ শাহচেরাগি নতুন গঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) যোগ দেন।
এই আদর্শিক বাহিনীতে যুক্ত হয়ে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ওয়াহিদি রাখেন, যার অর্থ এক বা প্রথম। সম্প্রতি, তিনি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ লাভ করেন। এই নিয়োগ এমন এক প্রেক্ষাপটে হয়েছে, যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে এবং ৪৭ বছর আগে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধের জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা পুনরায় স্মরণ করতে হচ্ছে। মার্চ মাস থেকে আইআরজিসির কার্যনির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ওয়াহিদি নতুন সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতারোহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ক্যারিয়ারে ওয়াহিদি বহু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অংশ ছিলেন। সামরিক নেতৃত্বের পদে নানা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গিয়ে, মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৮১ সালে তিনি আইআরজিসির গোয়েন্দা ডেপুটি নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালের মধ্যে তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জেরুজালেমকে মুক্ত করার লক্ষ্যে গঠিত এই বাহিনীটি বিদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন, সরঞ্জাম সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। যদিও পরবর্তীতে কাসেম সোলাইমানির (১৯৯৮-২০২০) আমলে বাহিনীটি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছায়, ওয়াহিদিই এর প্রাথমিক কর্মকাণ্ড ও ভাবনার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহর গঠনমূলক দিনগুলোতে।
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তাকে প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিক মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন, ফলে তিনি ইন্টারপোল রেড নোটিশ থাকা অবস্থায় ক্যাবিনেট মন্ত্রী হওয়ার প্রথম ব্যক্তিত্ব হন। কনজারভেটিভ সরকারের সঙ্গে তিনি বেশি কাজ করেছেন, আহমাদিনেজাদের প্রথম মেয়াদে প্রধান উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং ২০২১ সালে ইব্রাহিম রাইসির অধীনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা এবং ২০১০ সাল থেকে অস্ত্র প্রসারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
আহমদ ওয়াহিদির ক্যারিয়ার শুধুমাত্র সাফল্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি নানামুখী জটিলতাও মোকাবিলা করেছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের কেন্দ্রে থাকা সত্ত্বেও, বিভিন্ন বিতর্ক থেকে পুনরুত্থানের ঝুঁকি নেওয়া জেনারেল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইরাক যুদ্ধের ক্ষত মেটানোর সময় ওয়াহিদি যুদ্ধকালীন তৈরি হওয়া বহির্মুখী উদ্যমকে কাজে লাগাতে কুদস ফোর্সকে প্রথম বড় অভিযানে পাঠান; বসনিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আলিজা ইজেতবেগোভিচের পক্ষে। যদিও বসনিয়াতে আল কায়েদার মতো দলগুলোর আধিপত্য এবং শিয়াদের প্রতি বিদ্বেষের কারণে হিজবুল্লাহর মতো সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, সোলাইমানির অধীনে আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযানে ইরানের কৌশলগত সাফল্য অর্জিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত গোয়েন্দা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করেছিল।
বসনিয়া অভিযানে আশানুরূপ ফল না পেলেও ওয়াহিদি লেবানন ফ্রন্টে সক্রিয় থেকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেন। ১৯৯৪ সালে বুয়েনস আইরেসে এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে হিজবুল্লাহর হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনা ওয়াহিদিকে অভিযুক্ত করে। এই ঘটনা ইরান ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের মধ্যে স্থায়ী সংঘাত তৈরি করলেও, ওয়াহিদির অবস্থানকে আইআরজিসির অভ্যন্তরে দুর্বল করেনি বরং আন্তর্জাতিক এই অভিযোগগুলোকে বাহ্যিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে তেহরান তার নেতৃত্বকে আরও সংহত করে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে থাকাকালীন ওয়াহিদি সবসময়ই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার মনে করতেন। ২০১২ সালে তিনি ফাতাহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩০০ কিলোমিটারে উন্নীত করার কর্মসূচির তদারকি করেন। ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কার মুখে তিনি স্পষ্টভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের বিকাশকে ইসরায়েলবিরোধী প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন এবং ঘোষণা করেন যে ইরানে আক্রমণ চালানো হবে ইসরায়েলের জন্য আত্মঘাতী। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন বাভার-৩৭৩) গড়ে তোলার কাজেও সক্রিয় ছিলেন। পাশাপাশি, দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির সুরক্ষায় গোয়েন্দা তৎপরতার তদারকি করেন এবং ২০০৭ সালে ইসরায়েলি হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে গঠিত ওঘাব-২ সংস্থার দায়িত্ব নেন।
ওয়াহিদির ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈপরীত্য ছিল তার চরম আদর্শিক অবস্থান সত্ত্বেও কৌশলগত নমনীয়তা প্রদর্শন। ১৯৮৫-৮৭ সালের বহুল আলোচিত 'ইরান-কনট্রা অ্যাফেয়ার'-এ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের গোপন অস্ত্র চুক্তির বিষয়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ওয়াহিদির হিজবুল্লাহর ওপর প্রভাবই তেহরানকে সাহায্য করেছিল লেবাননে জিম্মি আমেরিকানদের মুক্ত করে ইসরায়েলের মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র সংগ্রহ করতে। তবে ক্ষমতার এই দীর্ঘ যাত্রায় তাকে বিপদেও পড়তে হয়েছিল; ১৯৮৮ সালে কেরমানশাহ প্রদেশে ইরাক সমর্থিত কমিউনিস্টদের (এমইকে) আক্রমণের দায় তার ওপর চাপানো হলে তৎকালীন আইআরজিসি প্রধান মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। পরে আলি আকবর হাশেমি রফসানজানির মধ্যস্থতায় তিনি বড় শাস্তি থেকে রক্ষা পান এবং পরবর্তীতে কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। অতি সম্প্রতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি ২০২২ সালের মাহসা আমিনী কেন্দ্রিক আন্দোলন শক্ত হাতে দমন করেন এবং আন্তর্জাতিক চাপকে ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন, যদিও পরবর্তীতে রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রশমনে নিজের রাজনৈতিক ডেপুটি মোহাম্মদ-রেজা গোলামরেজাকে অপসারণ করার মতো কৌশলগত নমনীয়তাও দেখান।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আহমদ ওয়াহিদি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির অধীনে কাজ করছেন। তার সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই এখন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি। দুজনেরই ইতিহাস দীর্ঘ এবং দুজনেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত হলেও তারা আইআরজিসির শক্তি সংহত করতেই কাজ করে যাচ্ছেন। ২০২৬ সালে এসে তেহরানের এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তি ওয়াহিদির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাটি একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ইউনিট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও পদক্ষেপের মোকাবিলা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি হুমকির মুখে ইরানের যুদ্ধকালীন প্রশাসনে রিভোলিউশনারি গার্ডসের প্রভাব চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হোরমুজ প্রণালীতে ভূরাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার এমন এক জটিল ও সংকটাপন্ন সময়ে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে ওয়াহিদির মতো অভিজ্ঞ ভেটেরানের উত্থান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব শক্তির চাহিদাকেই প্রতিফলিত করে।
সূত্র: এনডিটিভি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন