প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মাস্টার্সের সকল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, এখন কেবল ফল প্রকাশের অপেক্ষা। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আফসানা আনায়াত এমি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার আগেই নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় বছরের আইনি লড়াই শেষে হাইকোর্টে জয় লাভ করেছেন। আটকে থাকা ফলাফল ও শিক্ষাগত সনদ ফিরে পেয়েছেন তিনি। প্রকাশিত ফলাফলে ৩.৭১ সিজিপিএ নিয়ে মাস্টার্সে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। হাইকোর্টের রায়টি আইনি নজির হিসেবে ঢাকা ল রিপোর্টসে (ডিএলআর) প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনার শুরু ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী হলের সামনে রাত ১১.৩০ মিনিটে স্থাপনা ভাঙার চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় নিরাপত্তার দাবিতে শতাধিক ছাত্রী উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জড়ো হন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন এক সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে আফসানার তর্কবিতর্ক হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আফসানাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
মামলার আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি আফসানাকে আজীবন বহিষ্কারের সুপারিশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সেই সুপারিশ অনুমোদন করে। অথচ আফসানাকে প্রথম কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় ২ মার্চ। অর্থাৎ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নামেমাত্র কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে চূড়ান্তভাবে আজীবন বহিষ্কার আদেশ জারি করে।
প্রশাসনিকভাবে প্রতিকার না পেয়ে আফসানা হাইকোর্টে রিট করেন। তার পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে মামলাটি পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ ছাত্তার মোল্লা এবং ব্যারিস্টার মুস্তাক আহমেদ চৌধুরী।
২০২৫ সালের ৩০ জুন হাইকোর্ট বহিষ্কারাদেশের বিষয়ে রুল ও স্থগিতাদেশের পাশাপাশি ফল প্রকাশের নির্দেশ দেন। তবে ওই বছরের ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্ট ব্যাচের ফল প্রকাশ হলেও আফসানার ফল আটকে রাখা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে গেলে আইনি প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হয়।
অবশেষে কয়েক দফা শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২ জুলাই হাইকোর্ট ২৬ পৃষ্ঠার রায়ে আফসানার আজীবন বহিষ্কারাদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এই রায়টি Afsana Anayat Amey Vs. University of Chittagong & Others, 78 DLR (2026) 675 নামে নজীর হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
মামলার আইনজীবী মোহাম্মদ ছাত্তার মোল্লা বলেন, "আমি মামলা করার পক্ষে ছিলাম না। কারণ আমি জানি এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করে টিকে থাকা টাফ। বিষয়টা ঝুলে যাবে। বিকল্প কোন উপায় না পেয়ে অবশেষে আমি, এজ এ ফাইলিং লইয়ার, রীট ফাইল করলাম। ২০২৫ সালের ৩০ জুন রুল, স্টে এবং রেজাল্ট পাবলিকেশনের ডাইরেকশন পেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উক্ত আদেশের কপি সার্ভ করা হলো। কিন্তু প্রশাসনতো প্রসাশনই! আদেশ মানবে না! হাইকোর্টের আদেশ ভায়োলেট করে উক্ত শিক্ষার্থীর রেজাল্ট উইথহেল্ড করে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের মাস্টার্স রেজাল্ট প্রকাশ করা হলো বিগত ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই। তারপর আমি বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠালাম। বিশ্ববিদ্যালয় তারপর হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপীল ফাইল করলো। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি। আমার কথা ছিলো এটার শেষ দেখবো। তারপর যা হয় হবে। বিশেষ করে এই কারণে খুশি যে, আমাদের এই মামলার ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিসিপ্লিনারি রুলস প্রনীত হবে। শত শত হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে এমন হয়রানি থেকে পরিত্রাণ পাবে। আইনজীবী হিসেবে ঠিক এই জায়গায় আমার সার্থকতা।"
এই বহিষ্কারাদেশ কেবল আফসানার ফলাফলই আটকে দেয়নি, বরং বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ সময়টুকুও বদলে দিয়েছিল। যে সময়ে সহপাঠীদের সঙ্গে স্নাতকোত্তর শেষ করার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেই সময়ে তাকে লড়তে হয়েছে নিজের শিক্ষাগত পরিচয়টুকু ধরে রাখতে। আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে কেটে গেছে প্রায় দেড় বছর। এ সময়ের অনেক ঘটনা তিনি এত দিন নিজের মধ্যে রেখেছিলেন। অবশেষে সনদ হাতে পাওয়ার পর প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন সেই অভিজ্ঞতার কথা।
আফসানা আনায়াত এমি বলেন, "এটি ছিল দীর্ঘ ও কঠিন এক লড়াই, কিন্তু আমরা হারিনি। হাইকোর্ট বিভাগ বহিষ্কারের আদেশ অবৈধ ঘোষণার রায় বহাল রেখেছেন। গত দেড় বছরে আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত আমার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। রাখে আল্লাহ তো মারে কে। প্রতিটি অভিজ্ঞতার জন্য আলহামদুলিল্লাহ।"
এদিকে হাইকোর্টের রায়ের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আফসানার আটকে থাকা মাস্টার্সের ফল প্রকাশ করেছে এবং তাকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের মূল সনদ দিয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে ৩.৭১ সিজিপিএ নিয়ে আইন বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি। তবে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা প্রণয়নে আদালতের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনো সামনে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.মুহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রবিধান অনুসরণ না করে কোনো শিক্ষার্থীকে সরাসরি বহিষ্কার করা যায় না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। এর মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং তদন্ত কমিটি গঠনের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। কিন্তু অতীতে এক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করেই ওই শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে হাইকোর্টে সেই সিদ্ধান্ত টেকেনি।"
উপাচার্য আরও বলেন, "অনেক সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি বুঝতে বা মেনে নিতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে প্রশাসন কখনো কখনো নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত আদালতে টেকে না।"
তিনি আরও বলেন, "সম্প্রতি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এক শিক্ষার্থীর হাত ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি ও চাপের মুখেও প্রশাসন নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার বোঝানো হয়েছে। তারা কয়েক দফা কর্মসূচি পালন করেছেন এবং প্রশাসনের সমালোচনাও করেছেন। তা সত্ত্বেও আমরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস, এ ক্ষেত্রে গৃহীত সিদ্ধান্ত আইনানুগ হয়েছে। ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রবিধান অনুসরণ করা হবে।"
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটেছে এমির শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সময়, সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এসেছিল। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে ফিরে পেয়েছেন হারানো শিক্ষাগত স্বীকৃতি। তবে এই প্রাপ্তির পেছনে রয়ে গেছে দেড় বছরের অনিশ্চয়তা, প্রতিকূলতা এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের গল্প। মাস্টার্সে প্রথম হওয়ার অর্জন নিয়ে এভাবেই শেষ হলো আফসানা আনায়াত এমির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন