১১:২৪ এম
মানিকগঞ্জে অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যায় জেলার ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শত শত হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা রয়েছেন গভীর সংকটে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ গণমাধ্যমে জানিয়েছেন যে কৃষি মন্ত্রণালয় সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য পর্যালোচনা করে মানিকগঞ্জসহ সারাদেশে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদানের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরের পোশাক কারখানার গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চার ইউনিট
কৃষি সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র এ সপ্তাহে মানিকগঞ্জ জেলায় ৩০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অতিবृष्टির ফলে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়। ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এ বিষয়ে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মানিকগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, কৃষকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া না হলে আগামী মৌসুমের উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে এবং জেলার কৃষি অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা গণমাধ্যমকে বলেছেন, "মানিকগঞ্জে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। কৃষকরা যেন দ্রুত আবার চাষাবাদে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যেই জরুরিভিত্তিতে পুনর্বাসন সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।"
আরও পড়ুন: নেছারাবাদে বিএনপি নেতা মিঠুর গণসংযোগ, ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশা
তিনি আরও বলেছেন, "মানিকগঞ্জ রাজধানীর সন্নিকটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদনকারী একটি জেলা। এখানকার কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সময়মতো সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কৃষি উপকরণ ও অন্যান্য সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া গেলে তারা আগামী মৌসুমে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারবেন।"
মন্ত্রী আরও বলেন, "কৃষকদের এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে আমি আশা করি। কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি এবং তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে জেলার কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে।"
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মানিকগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎপাদনকারী জেলা। প্রায় ২৩৯ শতাংশ শস্য নিবিড়তার এই জেলা ধান, পাট, সরিষা, ভুট্টা, মরিচ, পেঁপে ও বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার উৎপাদিত সবজি ঢাকার বাজারের উল্লেখযোগ্য চাহিদা পূরণ করে। ফলে জেলার কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি রাজধানীর কৃষিপণ্যের সরবরাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে, ১০ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ২২১ হেক্টর পাট, ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং ৪৩০ হেক্টর মরিচের আবাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে এসব ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে যুবদলকর্মী কাওসার হাওলাদারকে সন্ত্রাসীদের হাতে হত্যা
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১৪৪ হেক্টর সবজি, ৫৫ হেক্টর পেঁপে, ১৬ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ৬ হেক্টর পাট ও ১ হেক্টর মরিচসহ মোট ২২২ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে ১৭ হেক্টর সবজি, ১৯ দশমিক ২৫ হেক্টর পেঁপে, ৪ দশমিক ৬ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা, ১ দশমিক ২ হেক্টর পাট এবং ১০ হেক্টর মরিচের আবাদ।
কৃষি বিভাগের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এসব জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৭১ দশমিক ৫ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এই ক্ষতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষকের ওপর, যাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকেই ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে আগামী মৌসুমে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য জরুরিভিত্তিতে বীজ, সার, কৃষি উপকরণ ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দ্রুত চূড়ান্ত করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সহায়তা বিতরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলে নিহত, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর পাঠানো চিঠিটি আমরা পেয়েছি। সেখানে মানিকগঞ্জ জেলায় অতিবৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"
সচিব আরও বলেছেন, "আমাদের লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে দ্রুত চাষাবাদে ফিরতে পারেন। এজন্য বীজ, সার, চারা ও অন্যান্য কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকার কৃষকদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তরিক রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন