প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাবনার ঈশ্বরদী আদিবাসী পল্লীতে একটি সময় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখানে পাঠদানের পাশাপাশি নিজস্ব ভাষার চর্চা করা হতো। তবে, সেটি এক দশক আগে বন্ধ হয়ে গেছে। পুরানো স্কুলের ভবন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল ও খেলার মাঠ সবই আগের মতোই রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভাব রয়েছে। স্কুলের দরজায় তালা ঝুলছে। যে স্কুল চত্বর এক সময় শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল, সেখানে এখন নীরবতা বিরাজ করছে। এই এলাকার আদিবাসী শিশুরা শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অভাব, অনটন, সামাজিক বৈষম্য, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, এ উপজেলায় পাঁচ হাজার আদিবাসী বসবাস করেন। এদের মধ্যে দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মারমী গ্রামে মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা বেশি বসবাস করে। এই পল্লীর শিশুদের জন্য কোনো নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তাদের নিজস্ব মালপাহাড়ি ভাষার শিক্ষা ও চর্চার ব্যবস্থা নেই। শিশুদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে এক থেকে দেড় কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। অনেক শিশু দূরের পথ পাড়ি দিতে চায় না, ফলে তারা শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে। মারমী আদিবাসী পল্লীতে ১৯৩২ সালে শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটি স্থানীয়দের সহায়তায় নির্মিত হয়। পরবর্তীতে এখানে পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। তবে, ২০১৬ সালে আর্থিক সংকটের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
আদিবাসী পল্লীর বাসিন্দারা জানান, স্কুলটিতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এখানে পাঠদানের পাশাপাশি আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা মালপাহাড়ির চর্চা হতো। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয়দের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হলেও অর্থাভাবে ২০১৬ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন আদিবাসী পল্লীর অনেক শিশু স্কুলে যায় না, তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করে। কিছু ছেলে-মেয়ে হেঁটে এক-দেড় কিলোমিটার দূরের স্কুলে গেলেও তাদের কষ্টের শেষ নেই।
মারমী গ্রামের আদিবাসী অমিত বিশ্বাস বলেন, "এক সময় আমি ও আমার বোন এ স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আর্থিক সংকটে এটি এখন বন্ধ। আমাদের এলাকার শিশুরা এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে পাশের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। শিশুরা অনেকেই দূরের স্কুলে যেতে চায় না। তারা মা-বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যাচ্ছে।"
ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ থেকে অনার্স পাস করেছেন মারমী আদিবাসী পল্লীর সঞ্জিত দাস। তিনি বলেন, "আমিসহ এ পল্লীর শিশুরা এক সময় নিজ এলাকার স্কুলে পড়তাম। পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের কারণে এটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পাশের গ্রামের স্কুলে এ এলাকার কিছু শিশু পড়াশোনা করে।"
মারমী আদিবাসী পল্লীর যুবক সমর বিশ্বাস বর্তমানে ঈশ্বরদী প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে মাঠ সমন্বয়কের চাকরি করছেন। তিনি বলেন, "আদিবাসী পল্লীর এ শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে বিএসএস পাস করেছি।"
তিনি আরও বলেন, "শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটি আদিবাসী পল্লীতে ছিল বলেই আমরা পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলাম। এখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরে আরও শিক্ষার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এ শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা শঙ্কিত। কারণ এখনো আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা নেওয়ার হার অত্যন্ত কম। নিজ পল্লীতে স্কুল থাকায় বেশির ভাগ শিশুই স্কুলে আসতো। কিন্তু এখন দূরের স্কুলে সবাই যেতে চায় না। অভিভাবকরাও শিশুদের দূরের স্কুলে না পাঠিয়ে সঙ্গে করে কাজে নিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে এভাবে চলতে থাকলে শিশুরা লেখাপড়া থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন