প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝে ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটে। চোরবাগান দুর্গোৎসব প্যান্ডেলে হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু ঘটে এবং ২৫ জনেরও বেশি গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার ফলে রাজ্যজুড়ে শোক, হাহাকার এবং জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে।
কলকাতা পুলিশের দীর্ঘ ছয় দশকের ভিড় নিয়ন্ত্রণের সুনাম থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপি সরকারের অদক্ষতা, পুলিশের দলীয়করণ, এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উগ্র রাজনীতির কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে সমালোচনা চলছে।
বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, কলকাতা শহর প্রতিবছর দুর্গাপূজায় কোটি কোটি মানুষের ভিড় সামলাতে অভ্যস্ত। কিন্তু চোরবাগানের ঘটনা প্রমাণ করে যে সঠিক ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। বৃষ্টির সময় প্যান্ডেলে প্রবেশের সংকীর্ণ পথ এবং জনস্রোত নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের ন্যূনতম ব্যবস্থা ছিল না।
সাবেক রাজ্যসভা সদস্য ও প্রাক্তন আইএএস অফিসার জওহর সরকারের মতে, পুলিশ বাহিনী ভিড় নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞ কৌশল প্রয়োগের চেয়ে নতুন শাসকদলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে বেশি ব্যস্ত ছিল। যখন ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি ছিল, তখন পুলিশ প্যান্ডেলের বাইরে বামপন্থী রাজনৈতিক দলের বইয়ের স্টল স্থাপন ও বিরোধীদের দমন করতে ব্যস্ত ছিল।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা এবং মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। অধিকাংশ সাধারণ মানুষের পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসা বহন করা সম্ভব নয়। চিকিৎসার গাফিলতি ঢাকার চেষ্টা এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ২৭% মুসলিম জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী এবং বিরোধী পক্ষকে লক্ষ্য করে বিতর্কিত মন্তব্য করে আসছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে সনাতনী আচার-আচরণ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, তিনি প্রশাসনিক যোগ্যতার চেয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ওয়্যার এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে একটি "একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক" শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা ছাঁটাই এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে হওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারে মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নেই।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক তৃণমূল নেতাদের দলে টেনে এবং পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে রাজ্যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। উৎসবের মৌসুমে উত্তর ভারতের খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় আচার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রাজ্যের বহুমাত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তর কলকাতার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক বক্তৃতা, অর্থ কিংবা উগ্র মেরুকরণ দিয়ে ভালো শাসনব্যবস্থা তৈরি করা যায় না।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কলকাতা সফর করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমেনি। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, প্রশাসন ও পুলিশকে অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীকে একজন "উগ্র রাজনৈতিক প্রচারক" না হয়ে একজন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে আচরণ করতে হবে, অন্যথায় এই গণক্ষোভ বিজেপি সরকারের স্থায়িত্বকেই বড় প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন