প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৭ জুলাই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাসূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের গত সাত মাসে কুমিল্লায় ৮৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও পরে অনেকেই জামিন বা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অপরাধ চিত্রে দেখা যায়—ডিসেম্বরে ৯টি, জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১৭টি এবং জুনে ১০টিসহ মোট ৮৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৯৭টি।
এ ছাড়া গত ছয় মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৩০২টি, ডাকাতি ৩৩টি এবং অপহরণের ঘটনা ১৪টি। অপমৃত্যু হয়েছে ৩৪৮টি। এ সময় পুলিশ ৪৮টি অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
মাদক ব্যবসা এবং এলাকার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ২৫ জুন নগরীর কাঁটাবিল এলাকায় মাদকবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলা ও গুলির ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ পাঁচজন আহত হয়। গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী ইথান আহম্মেদ প্রেম কাঁটাবিল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠান।
সবশেষ চলতি মাসে নগরীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় একটি জলাশয় থেকে জুম্মান নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ৪ মার্চ দুপুরে ঢাকা যাওয়ার সময় অপহরণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক আবদুর রাজ্জাক সোহেল। জোরপূর্বক তাকে গাড়িতে তুলে অপহরণকারীরা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন সড়ক ধরে নিয়ে যায় এবং দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। এ সময় তার কাছে থাকা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, মানিব্যাগে থাকা প্রায় ১৫ হাজার টাকা এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে তিন হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা।
৫ মার্চ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. হোসাইন ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী সায়েদ হাসান কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড় এলাকা দিয়ে হাঁটার সময় শপিং ব্যাগের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হামলার শিকার হন। এ সময় তাদের মারধর করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করা হয়। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে আহত হন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান শিপন।
২২ আগস্ট কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে লোকাল সেন্টমার্টিন পরিবহণ নামের একটি চলন্ত বাসে ধর্ষণের চেষ্টা করে পাঁচজন। এর মধ্যে দুইজনকে সেদিনই শিক্ষার্থীরা আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। বাকি তিনজন পালিয়ে যায়। পলাতক তিন আসামিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি দুইজন এখনো পলাতক রয়েছে।
এ ছাড়া গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় নিজ বাসায় খুন হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন রিনথী ও তার মা তাহমিনা।
এদিকে, শহর ও মহাসড়কগুলোতে রাত গভীর হলে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের হামলায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর নিহত হওয়ার ঘটনা জেলাজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা কখনো যাত্রীর, আবার কখনো চালকের ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে অপরাধ সংঘটিত করছে।
অন্যদিকে, কুমিল্লা নগরীতে কয়েক ডজন কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সম্প্রতি এসব গ্যাংয়ের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময় দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তাদের মহড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তুলনামূলক কমসংখ্যক সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বয়স কম হওয়ায় অনেক সদস্য দ্রুত আইনি সুবিধা পেয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
সম্প্রতি অস্ত্রসহ আটক কয়েকজন অপরাধী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের সদস্যদের কথিত ওঠাবসার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এসব পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র প্রায় ২৩ শতাংশ আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে কুমিল্লা শহর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বিভিন্ন মেসে বসবাস করতে হয়।
প্রতিদিন ক্লাস, পরীক্ষা, টিউশন ও অন্যান্য প্রয়োজনে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করায় তারা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিতে থাকছেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের সময় শহর থেকে ক্যাম্পাসে কিংবা ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া রাতে বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিজের অপহরণের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ সবুজ বলেন,
“আমাকে যখন অপহরণ করা হয়, তখন রাত প্রায় ১০টা। এই সময়ে টিউশন শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। শহর থেকে সর্বশেষ বাস আসে সাড়ে ৮টায়। ফলে যারা বিভিন্ন কারণে এই সময়ের পর ফিরে আসেন, তাদের একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যায়। সবকিছু বিবেচনায় উপাচার্য মহোদয়ের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেছিলাম, অন্তত একটি বাস যেন রাত ৯টায় দেওয়া হয়। বাস সংকটের কারণে তখন দেওয়া হয়নি। নতুন ভিসি স্যার এসেছেন, তার চিন্তায় ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’। বাসও আছে। তাই বলব, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় অন্তত একটি বাস রাত ৯টায় দেওয়া হোক।”
তিনি আরও বলেন,
“এর বাইরে শহরে আমাদের প্রশাসনিক কোনো কেন্দ্র নেই। শহরে থাকা বা টিউশনে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিভিন্ন সময় ছিনতাই, চুরি, অপহরণ এমনকি খুনেরও শিকার হন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্যাম্পাসের রেসপন্সের ওপর নির্ভর করতে হয়। শহরে যদি একটি স্থায়ী হেল্প ডেস্ক থাকত, তাহলে বিষয়গুলো খুব সহজে দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা যেত।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“কুমিল্লা শহরে খুন, ছিনতাইসহ অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। হল সংকটের কারণে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী শহরের মেস ও ভাড়া বাসায় থাকেন এবং প্রতিদিন যাতায়াত করেন। ফলে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়ছে। এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ মাদকের সহজলভ্যতা ও মাদকাসক্তির বিস্তার। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত টহল এবং মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা জরুরি।”
একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী সৈয়দা নাজিফা নাফিল বলেন,
“কুমিল্লা শহরে তুলনামূলকভাবে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দিন দিন বাড়ছে। খুন-খারাবির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা সংকটে ভুগছেন। শুধু মেয়েরা নয়, বর্তমানে সব শিক্ষার্থীই ঝুঁকিতে আছেন। বিগত কয়েক দিন আগে ক্যাম্পাসে একজন শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত কয়েকজন মিলে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছ থেকেও কোনো রেসপন্স পাওয়া যায়নি। আসলে এ ব্যাপারে প্রশাসনের আরও সচেতন হওয়া উচিত এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন,
“এ বিষয়ে আমরা এসপি বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছি এবং প্রতিনিয়ত আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।”
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রোজী আক্তার বলেন,
“আপনি এ বিষয়ে আমার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম)-এর সঙ্গে কথা বলুন।”
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন,
“আমাদের ডিসি অফিসে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দেশনা দেওয়া আছে যে, যখন যেখানে যেমন অপরাধ দেখা দেবে, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেবে। অপরাধ প্রবণতা বাড়ার বিষয়ে আলাদাভাবে পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং আমাদের সিদ্ধান্তও সেভাবেই রয়েছে। পুলিশও আমাদের সভায় উপস্থিত থাকে। সব বাহিনী বিশেষভাবে কাজ করছে। অবশ্যই আমাদের আলাদা নজর রয়েছে। অপরাধ বাড়লে বিষয়টি আমরা আলাদাভাবে দেখি।”
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন