প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাষ্ট্রকে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংবিধানে। সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা যেন চিরকাল অধরা। জটিল নয়, সরলীকরণ করেও যদি বলতে হয়, দেশের স্বাস্থ্য খাত নিতান্তই ব্রাত্য। যুগের পর যুগ ধরে এই খাত নিজেই আক্রান্ত জটিল ও দুরারোগ্য রোগে। কখনো পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হয়নি।
বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র প্রতিটি শাখায় রয়েছে। শহুরে ও গ্রাম্য স্বাস্থ্য কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য আজও দূর হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্যের নাজুক দশা কাটাতে চান। তিনি মনে করেন, ‘স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার’ বলে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
এই নীতিকে রাজনৈতিক কথাবার্তার বাইরে রেখে বাস্তবে রূপদান করে একটি উন্নত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করছেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
শহরের তুলনায় গ্রামে জনসংখ্যার হার বেশি। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরে বসবাস করে ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ এবং গ্রামে ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সংখ্যার দিক দিয়ে গ্রামে বসবাস করছে ১১ কোটি ৬১ লাখ মানুষ।
এবং শহরে ৫ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ বাস করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ গ্রামে বসবাস করলেও শহর এলাকায় চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই সেবা প্রদান করেন। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিদারুণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।
গ্রাম ও শহরের এই স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করতে সরকার সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য খাতে বর্ডৃতক রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও। যেখানে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিজাত শ্রেণি ও প্রান্তিক জনগণ সরকারিভাবে সমান স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ফিরবে সেবার সমতা। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা যথেষ্টও প্রকাশ করেছে সরকার।
প্রান্তিক জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারপ্রধান তারেক রহমান গত মাসে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে জানান, ‘দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের দায়িত্ব হবে গ্রামে-গ্রামে, ঘরে-ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির। শহরেও তারা থাকবে, তবে আমরা গ্রাম নিয়ে বেশি গুরুত্ব দেব।’
দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন আনার ইচ্ছে রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তৃণমূল জনগণের স্বাস্থ্য সেবা সহজসাধ্য করার জন্য বেশ কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালু করার পরিকল্পনা বিদ্যমান। সরকারের উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো বিভিন্ন সংকটে ভারাক্রান্ত। শয্যা সংকটে পরিবেশদূষণের কারণে চিকিৎসাসেবা চলছে গাদাগাদি করে। জনবল ও সরঞ্জামের সংকটের মধ্যে রোগীরা সুফল পাচ্ছেন না। সব রকম ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে টাকার বিনিময়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন।
কিছু ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছে না। যাদের সাধ্য নেই, তাদের বাধ্য হয়ে এখানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকার এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে একটি বিস্তৃত, সুচিন্তিত এবং সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর উদ্যাগে সরকার ইতোমধ্যে ৫০ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ পর্যয়ে স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও শক্তিশালী হবে। ৫টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্যে এগোনো হবে। এ ছাড়া চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে নারীদের জন্য ১ হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণেও পরিকল্পনা রয়েছে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব ও নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কাজ করছে। এখন থেকে সব মানুষ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা পাবেন, আর্থিক অবস্থার বিবেচনায় নয়। এমন স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা হবে যাতে কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত না হন।’ প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর এই কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট, সরকার শহুরে সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার বাস্তব পরিকল্পনা আসছে।
প্রধানমন্ত্রীর জীবনসঙ্গী জানেন শহরে চিকিৎসক, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামে পরিস্থিতি সহজ নয়। সেখানে দূরত্ব ও ব্যয়ের কথা বিবেচনায় গ্রামীণ নারীরা প্রায়ই ঘরেই সন্তান জন্ম দেন। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সেবা তাদের জন্য ‘গরিবের ঘোড়ারোগ’ হয়ে যায়। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলভিত্তি ও স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে ভাবা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।’
সরকার যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) মডেল অনুসরণ করে একটি সমন্বিত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে সবার জন্য ডাক্তার থাকার ব্যবস্থা করা হবে। একই সাথে উপজেলা পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। এমনভাবে পরিবর্তন করা হবে একদিকে যেমন শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হবে, তার চেয়ে সেবা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হবে যাতে শিশুদের জন্য চিকিৎসক, নারীদের জন্য চিকিৎসক, এবং ফিজিওথেরাপির জন্য চিকিৎসক থাকা নিশ্চিত হবে। একইসাথে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোও নতুনভাবে সাজানো হবে। যেহেতু ডিজিজ বার্ডেন পরিবর্তিত হয়েছে, অর্থাৎ আগে ছিল সংক্রামক রোগ, এখন লাইফস্টাইল ডিজিজ হচ্ছে, সে কারণে প্রতিটি জেলায় করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো বিষয়গুলোর দিকে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা নেবে।’
স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের অচলায়তন ভাঙার সঙ্গে একটি সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে শহর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য সহায়িকা ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে সরকারকেও কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথমত, উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অর্থ বরাদ্দ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ ফোকাস দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের গ্রামে অবস্থান করতে উৎসাহিত করতে হবে। যারা সীমিত সাধ্যের মধ্যেও চিকিৎসা ব্যবস্থা সচল রেখেছেন, তাদের সাধুবাদ জানাতে হবে। তাদের জন্য ভালো বাসস্থান, নিরাপত্তা এবং সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের পেশাগত উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব অভাব বা দুর্বলতা দূর করতে পারলে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবুও সরকার ধাপে ধাপে তা অর্জনের পথে চলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন