প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জান্নাতুল ফেরদৌস প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর স্বামীর অন্য একটি বিয়ের তথ্য জানার পর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। এর পরই স্বামী রাজা মিয়া পরিকল্পিতভাবে নৌকায় ঘুরতে নিয়ে জান্নাতুলকে হত্যা করে হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করেন।
মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মুসলিম উদ্দিন ও শুক্কুর আহমদকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তাদের মধ্যে একজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮) একটি জুতার কারখানায় কর্মরত ছিলেন। তিন বছর আগে তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি সাত বছর বয়সী মেয়ে তানিসাকে নিয়ে রাজা মিয়ার সঙ্গে নগরের বহদ্দারহাট সিগন্যাল এলাকায় বসবাস শুরু করেন। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি শপিং ব্যাগ তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন। একসময় জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজা মিয়া পূর্বে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
পিবিআই জানায়, বিরোধের জেরে রাজা মিয়া জান্নাতুলকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। তিনি তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে মুসলিম উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে কালুরঘাট ব্রিজ এলাকার এক কবিরাজের কাছে যান। সেখানে ঝাড়ফুঁক ও বিভিন্ন তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজা মিয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে জান্নাতুলকে বেড়ানোর কথা বলে কর্ণফুলী নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে মো. মুসলিম উদ্দিন, আরমান ও রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুক্কুর আহমদ তার মালিকানাধীন স্যাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। এরপর বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে নৌকায় তুলে আসামিরা কর্ণফুলী ব্রিজের নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করেন। সেখানে মুসলিম উদ্দিন ও অপর আসামি শুক্কুর উপস্থিত ছিলেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে জান্নাতুলের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান রাজা মিয়া। এক পর্যায়ে তিনি জান্নাতুলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে শিকলবাহা খালে ফেলে দেন। এরপর রাজা মিয়া জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন। আরমান নামের আরেক ব্যক্তি রশি দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন। এতে কিছুক্ষণের মধ্যে জান্নাতুলের মৃত্যু হয়। পরে রাজা মিয়া ও আরমান জান্নাতুলের হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে লাশটি বস্তাবন্দি করেন। এরপর কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় লাশ ফেলে তারা পালিয়ে যান।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ঘটনার চার দিন পর, ২ আগস্ট, কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা খাল থেকে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জান্নাতুলের পরিবারের সদস্যরা লাশটি শনাক্ত করেন। জান্নাতুলের পরিবার রাজা মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করে। কারণ, ঘটনার পর থেকে রাজা মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল।
এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় মামলা করেন। পরে গত ৬ অক্টোবর মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সদরঘাট নৌ পুলিশ থেকে তদন্তের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা আসামি মো. মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর আসামি শুক্কুর আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত স্যাম্পান নৌকাটি জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, মুসলিম উদ্দিন বুধবার আদালতে নিজের সম্পৃক্ততা ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলাটির তদন্ত চলছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন