প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার অ্যাপোলো ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্ত্রোপচারের পর অসুস্থ হয়ে পড়া এক প্রসূতির রংপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। নিহত প্রসূতি মিম নাগেশ্বরী উপজেলার সাঞ্জুয়ারভিটা এলাকার মামুন মিয়ার স্ত্রী। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মাত্র চার দিনের এক নবজাতক মাতৃহারা হয়েছে। আকস্মিক এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নাগেশ্বরীর অ্যাপোলো ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মিমের অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক জান্নাতুল ফেরদৌস রুমা এবং অ্যানেসথেসিয়ার দায়িত্বে চিকিৎসক শবনম ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্রোপচার চলার পর চিকিৎসকেরা রোগীর স্বজনদের জানান, অপারেশন ভালো হয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায় বলে অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনেরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত আড়াইটার দিকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার কথা জানিয়ে তাঁকে দ্রুত রংপুরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এ সময় পরিবারের সদস্যরা রোগীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মো. নুরুল ইসলাম (ডিএমএফ) রোগীকে রংপুরে রেফার করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিমকে পরবর্তী সময়ে রংপুরের ডক্টরস ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাঁর পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয় বলে স্বজনেরা জানান।
স্বজনদের অভিযোগ, রংপুরে চিকিৎসার সময় তাঁদের জানানো হয়, আগের অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পেটে ফুল বা প্লাসেন্টার অংশ রয়ে গিয়েছিল। তাঁদের দাবি, এর ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণসহ শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়ে রোগীর অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিমের মৃত্যু হয়।
তবে আগের অস্ত্রোপচারে সত্যিই কোনো চিকিৎসাগত ভুল হয়েছিল কি না, পেটে কোনো অংশ অবশিষ্ট ছিল কি না এবং মৃত্যুর সঙ্গে এসব বিষয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, অস্ত্রোপচারের প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো চিকিৎসা প্রতিবেদন বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।
মিমের মৃত্যুতে সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে তাঁর নবজাতক সন্তান। পৃথিবীতে আসার মাত্র চার দিনের মাথায় শিশুটি হারিয়েছে মাকে। যে সময়ে মায়ের স্নেহ, যত্ন ও বুকের দুধ পাওয়ার কথা, সে সময়েই শিশুটির জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন মা। অন্যদিকে স্ত্রীকে হারিয়ে শোকাহত স্বামী মামুন মিয়া ও পরিবারের সদস্যরা।
একটি অস্ত্রোপচারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এ ঘটনার পরিণতি একটি পরিবারের জীবনে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নবজাতকের ভবিষ্যৎ, তার লালন-পালন এবং পরিবারের মানসিক বিপর্যয়—সবকিছু মিলিয়ে স্বজনদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ ঘটনায় রোগীর অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ, শারীরিক অবস্থার অবনতি শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং সময়মতো উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর রোগীর অবস্থা কেন খারাপের দিকে গেল এবং রংপুরে পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কেন হলো এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তবে কেবল পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চিকিৎসাগত অবহেলা কিংবা ইচ্ছাকৃত ভুলের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য, ক্লিনিকের নথিপত্র, রংপুরের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
মিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও সচেতন মহল। তাঁদের প্রত্যাশা, অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে রোগীর অবস্থার অবনতি, রেফার এবং পরবর্তী চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ যাচাই করা হবে। তদন্তে কারও অবহেলা বা দায় প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
একজন মায়ের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চার দিনের এক অসহায় নবজাতকের ভবিষ্যৎ। তাই আবেগের পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন